ভোট দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে প্রচার নোতেবালার

57

বাণীব্রত চক্রবর্তী, ময়নাগুড়ি : আবার একটা ভোট এসে গেল দোরগোড়ায়। প্রখর রোদ চৈত্রের ভরা দুপুর। রাস্তার পাশের জমিতে বসে আলু তোলার কাজ করছিলেন ষাটোর্ধ্ব নোতেবালা রায়। হঠাত্ একটা গাড়ির কনভয় এসে থামল মোড়ের মাথায়। গলায় উত্তরীয় জড়িয়ে করজোড়ে নেমে এলেন প্রার্থী। পিছনে বহু মানুষ। আলু তোলার কাজের ফাঁকে নোতেবালাদেবী মাথা ঘুরিয়ে লক্ষ করলেন। বুঝতে পারলেন দোরগোড়ায় ভোট। বাবুরা আবার এলেন মহল্লায়। পাড়ার ছেলেরা ভিড় ঠেলে প্রার্থীর সঙ্গে এগিয়ে গেল। সারাদিন রোদে পুড়ে কেবলমাত্র রোজগার ৩০০ টাকা। তার উপর স্বামী নেকেরু রায় প্রতিদিন কাজ করতে পারেন না। তাইতো কাজে নামতে হয়েছে তাঁকেই। পারিপার্শ্বিক চাপ এতোটাই যে বেশিক্ষণ দেখারও সুযোগ নেই। ফের নিজের কাজে মন দিতে হল।

ময়নাগুড়ি শহরে রেলস্টেশনের পাশেই থাকেন নোতেবালা। রাতে বাড়ি ফিরে উঠোনে বসে রান্না সারছিলেন। পাশেই ফেলে রাখা ভাঙা কাঠের টুলে বসলেন স্বামী নেকেরু রায়। ভাঙা শালপাতার একটা হাতপাখা নাড়ছিলেন। সারাদিন পরিশ্রমের পর ভোটের আলাপচারিতায় মেতে উঠলেন দুজনেই। নোতেবালাদেবী নিজের মতো করেই ভোট নিয়ে সচেতনতার প্রচার চালান। তা পছন্দের নয় স্বামী নেকেরুর কাছে। স্বামীর পছন্দ না হলেও নোতেবালাদেবী কিন্তু সিদ্ধান্তে অনড়। গ্রাম ঘুরে ভোটের প্রচার করে বেড়ান। দলের হয়ে নয়, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের দাবিতে। বাবার একমাত্র কন্যা। পাশের পাড়াতেই থাকেন বাবা এবং মা। মা কাননবালাদেবী নাকি আগে রাগ করে বলতেন সবটাতেই নোতেবালার বাড়াবাড়ি। বিয়ে হয়ে আসার পর দুই মেয়ে জনতা এবং ললিতার বিয়ে দিয়েছেন। তখন থেকেই ভোট দেখছেন।

- Advertisement -

এখনকার ভোট অনেকটাই বদলে গিয়েছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে কাদা ছোড়াছুড়ি। হিংসার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে সর্বত্র। পাড়ার তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা পরিতোষ রায় অবশ্য অকপটে স্বীকার করে নিয়েছেন নোতেবালা রায়ে কথা। তিনি বলেন, বৃদ্ধা বরাবরই আলাদা। মানুষকে সচেতন করেন। নোতেবালাদেবী বলেন, আগে এমন ভোট দেখিনি। বাবার কাছে গল্প শুনেছি। তখনকার দিনে কাউকে প্রার্থী করার প্রস্তাব দিলেই করজোড়ে কান্নাজুড়ে দিতেন। সেই দিন কোথায় হারিয়ে গেল। কিছুতেই ভোটে প্রার্থী হবেন না। কিন্তু এখন একেবারেই আলাদা চিত্র। টিকিট না দিলেই বিরোধী দলে টিকিট নিতে ভিড় জমাচ্ছেন নেতারা। ভোটে লড়াই করাটাই যেন মুখ্য বিষয়।

এসব ভেবেই দিন-রাত কেটে যায় নোতেবালা রায়ের। ফের অপেক্ষা আরও একটি সকালের। সবসময় কাজও মেলে না। এখন আলু তোলার কাজ মিলছে। কখনও আধপেটা খেয়ে কেটে যায় দুজনের। তবুও মুখে কোনও অভিমান নেই। এভাবেই দিন কাটিয়ে যেতে চান বৃদ্ধা। সামাজিক কল্যাণে সব কিছুর ফাঁকে এভাবেই প্রচার চালিয়ে যেতে চান নোতেবালাদেবী। কোনও রাজনৈতিক দলের হয়ে নয়, এই প্রচার একেবারেই আলাদা রকমের। নেকেরু বয়সকালীন ভাতা পেলেও নোতেবালাদেবী এখনও পাননি। তবে নাম নতুন করে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। দুয়ারে সরকার কর্মসূচিতে গিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন। বয়সকালীন ভাতার জন্য ফর্ম পূরণ করে দিয়েছেন। বাড়ির পাশে দুয়ারে সরকার কর্মসূচিতে  গিয়ে বেশ খুশি বৃদ্ধা।