এখন করোনার মরশুম, এখন কোনও প্রতিবাদ নয়

রহিত বসু : সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং-এর বাংলা হয়ে গিয়েছে সামাজিক দূরত্ব। সংক্রমণ ঠেকাতে একে অপরের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে চললে তাকে শারীরিক দূরত্ব না বলে কেন সামাজিক দূরত্ব বলতে হবে, আমার তা মাথায় ঢোকেনি। আমাদের দেশে বেশ মজা রয়েছে। কোনও একদিন ঘরে পৌঁছাবেন এমন আশা নিয়ে হাজার হাজার মানুষ হেঁটে চলেছেন। কেউ খাবার পাচ্ছেন, অনেকেই পাচ্ছেন না। সন্তানের হাত ধরে মাথায় পুঁটলি নিয়ে বাবা হাঁটছেন, তারই পাশ দিয়ে হেঁটে চলেছেন অন্য এক পরিবারের গর্ভবতী। অভুক্ত মা সন্তান কোলে নিয়ে এবং মাথায় গোটা সংসার চাপিয়ে কিলোমিটারের পর কিলোমিটার হেঁটে চলেছেন। অনেক কাল পরে কলকাতার রাস্তায় ভুখা মানুষের ঘোরাফেরার ছবি দেখা য়াচ্ছে। গরিব মানুষের খাবার জোটাতে হয় কমিউনিটি কিচেন খুলতে হচ্ছে, নতুবা চাল-ডাল-তেল-আলু প্যাকেটে ভরে বাড়িতে পৌঁছে দিতে হচ্ছে। ঠিক সেই সময়ে দেখুন আকাশ থেকে হেলিকপ্টার ফুল ছড়াচ্ছে। আমি নিশ্চিত, কোনও জায়গায় নিশ্চয়ই কিছু ফুল ভুখা মানুষের খালি থালায় পড়েছে। ঠিক এই সময়ে রাহুল গান্ধি মাঝে মাঝে সাংবাদিকের ভূমিকায়।

আবার দেখুন, য়াঁরা সকাল থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে চড়া দামে মদ কিনছেন, তাঁদের অনেকেই নিশ্চয়ই বিনা পয়সায় সরকারি র‌্যাশনও নিচ্ছেন। মানে, মদ কেনার পয়সা জুটছে, কিন্তু চাল-ডালের জন্য সরকার ভরসা। এমন পরিস্থিতিতে টলিউড থেকে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, সরকার যদি মদের দোকান খুলে দিতে পারে তাহলে শুটিং চালু করতে অসুবিধা কোথায়? এক পরিচালক বলছেন, যে রকম দূরত্ব মেনে মদ বিক্রি হচ্ছে, সেরকম দূরত্ব মেনেই তো শুটিং চালু করা যেতে পারে। তাঁর যুক্তি, ৪২-৪৩ দিন হয়ে গেল, সিনেমা-টেলিভিশনের অভিনেতা ও কলাকুশলীদের কোনও রোজগার নেই। কেউ জানে না, এই সব প্রশ্নের জবাব কে দেবে।

- Advertisement -

যেমন, কলকাতায় মিটার রিডিং না হওয়া সত্ত্বেও সিইএসসি বাড়িতে বিদ্যুতের বিল পাঠিয়ে দিচ্ছে। বিলে কোন খাতে কত টাকা নেওয়া হচ্ছে, তার কোনও বিবরণ থাকছে না। থাকবে কী করে? লকডাউনের জমানায় তো মিটার রিডিং হচ্ছে না। এবার দেখুন, গোটা মার্চ মাসে কেউ হয়তো বাড়িতেই ছিলেন না। কাজে বাইরে ছিলেন। তাঁকেও অনলাইনে বিল মেটাতে হচ্ছে। যেসব ছোট কারখানা, ছোট দোকান, ছোট রেস্তোরাঁ লকডাউনের জন্য বন্ধ রয়েছে তাদের কাছেও এমন গড় হিসেবে বিল পাঠানো হচ্ছে। ধরা যাক, সিইএসসি বলল, পরের কোনও বিলের সঙ্গে এই টাকা অ্যাডজাস্ট করা হবে। ভালো কথা। কিন্তু সেই টাকা কি সুদ সহ অ্যাডজাস্ট করা হবে? একবার সিইএসসি-র গ্রাহকের সংখ্যা কত জেনে নিন, তারপর মোট সুদের পরিমাণ কত হতে পারে, আন্দাজ করুন। উত্তরবঙ্গে তো আরও মজা। তিন মাসের বিল একসঙ্গে আসে। কেন আসে ভগবান জানে! এপ্রিল মাসে বেশিরভাগ জায়গায় বিল আসেনি, কোনও কোনও জায়গায় এসেছে। এখানেও সেই গড় হিসেবের খেলা। সব চলছে করোনার নামে। শিলিগুড়িতে আমাকে একজন বলেছিলেন, পুজোর সময় বিলে ভেলকি দেখা যায়। তিনি দুটো বিলের পরিসংখ্যান তুলনা করে দেখিয়েছিলেন, অন্য সময়কার বিলের সঙ্গে পুজোর সময়কার বিলের কয়েক হাজার টাকার ফারাক। এখন এই সব সমস্যার বিহিত কে করবে, কেউ জানে না।

এখন এই সব প্রশ্ন তোলাও যাবে না। কারণ, সবাই বলছেন, করোনার সময় অন্য কোনও কথা বলা চলবে না, রাজনীতির কথা তো একেবারেই নয়। অতএব এই বাজারে যে কোটি কোটি মানুষ বেকার হয়ে গেলেন, তা নিয়ে আলোচনা চলবে না।

অথচ, একবার পরিসংখ্যানের দিকে তাকালেই বোঝা যাবে পরিস্থিতি কতটা গম্ভীর। শুধু গত মাসেই ১২ কোটির বেশি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) বলছে, ৩ মে পর্যন্ত কাজ হারিয়েছেন ২৭.১ শতাংশ মানুষ। সব থেকে বেশি আঘাত এসেছে দিনমজুর এবং ছোট ব্যবসার কর্মীদের উপর। এর মধ্যে হকার, নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মী ও শ্রমিক, ফুটপাথের দোকানদাররাও রয়েছেন। এরা সবাই জোড়া সমস্যার মুখে পড়েছেন। করোনার হাত থেকে যদি কোনওক্রমে বেঁচেও যান, রুটিরুজির জোগাড় কী করে হবে, তা নিয়ে যাবতীয় আশঙ্কা।