নাগরাকাটা : স্বাধীনতা সংগ্রামীদের দেওয়া বন্ডের থেকেও বড় হাতিয়ার আর কিছুই হতে পারে না বলে মনে করেন লুকসান চা বাগানের ছিয়াশি বছরের লাল বাহাদুর সুব্বা। বাবা নন্দলাল সুব্বার রেখে যাওযা ওই বন্ডকেই তিনি এনআরসি-র প্রামাণ্য দলিল হিসাবে আগলে রাখছেন।তিনি বলেন, ‘ব্রিটিশশাসিত বাগানে বাবা লুকিয়ে চুরিয়ে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অর্থ দিযে সাহায্য করতেন।বিনিমযে তাঁরা একটি বন্ড দিয়েছিলেন।দেশ স্বাধীন হলে সেটা দেখালেই বন্ডে লেখা প্রতিশ্রুতিমতো টাকা মিলবে বলে বাবাকে বলা হয়েছিল।পরে টাকা আমরা কেউই নিইনি। এনআরসি নিয়ে চারদিকে যা শুনছি দেশের নাগরিক প্রমাণে এর থেকে থেকে বড় নথি আর কীই বা হতে পারে।’ লুকসানের সমস্ত লিম্বু-সুব্বা পরিবারের ক্ষেত্রেও ওই বন্ডই এনআরসি মোকাবিলার সবচেযে বড় হাতিয়ার।

প্রয়াত নন্দলালের ছেলে লালবাহাদুরের লুকসান বাগানের বড়াকোঠি লাইন নামে একটি শ্রমিক মহল্লার বাড়িতে যে বন্ডটি রয়েছে সেটি ১ হাজার টাকার। তাতে ইংরেজিতে লেখা আছে ‘দ্য বন্ড অফ ইন্ডিযান ফ্রিডম আনলিমিটেড।’ মাঝে লাল রংযে চরকার জলছাপ।দু-পাশে গান্ধি, নেহরু, জিন্না সহ ছয় নেতার ছবি।লালবাহাদুর বলেন, ‘বাবা মারা যাওয়ার আগে বন্ডের রহস্য সব খুলে বলে যান।তিনি প্রায়শই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আর্থিকভাবে সাহায্য করতেন।দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাবা বন্ড আর ভাঙাননি।আমরাও তা করিনি।কীভাবে কোথায় গেলে টাকা পাওয়া যেতে পারে সেটা অবশ্য জানা ছিল না।

চা বাগানের শ্রমিকদের কারোরই জমির পাট্টা বা ওই সংক্রান্ত কোনো নথিই নেই।মালিকের লিজ হোল্ড জমির ওপরই বংশপরম্পায় শ্রমিকদের ডুযার্সের বাগানে বসবাস প্রায় দেড়শো বছর ধরে। লালবাহাদুর বাগানের যে বাড়িতে থাকেন সেই জমিরও কোনো নথি নেই।তবে তিনি মনে করেন তাঁর কাছে যা রয়েছে হাজারো নথিও সেটার সমতুল্য হতে পারে না।

ওই পরিবার সূত্রেই জানা গিয়েছে, লালবাহাদুরের বাবা নন্দলাল লুকসান বাগানে আসেন ১৯১৮ সালে।সেসময় বাগানটি নিদাম চা কোম্পানির আওতায় ছিল।সর্দার হিসেবে তিনি ১৯৬২ সাল পর্যন্ত বাগানে কাজ করেন।তাঁর মৃত্যুর পর ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে পড়াশোনা করা লালবাহাদুর ওই কাজে যোগ দেন।জীবদ্দশায় নন্দলাল অত্যন্ত প্রভাবশালী মানুষ ছিলেন।ব্রিটিশ ম্যানেজাররাও তাঁকে সমঝে চলতেন ব্যক্তিত্বের কারণে।শতাব্দী প্রাচীন লুকসান হাটের জমির ইজারাও তিনি নিদাম চা কোম্পানির কাছ থেকে নিয়েছিলেন। ১৯৩৩ সালের ১৮ ডিসেম্বরের একটি নথি অনুযাযী হাটের ইজারা বাবদ নিদাম কোম্পানিকে তিনি ৩৫ টাকা ফিজ জমা দেন।

তার পরের বছর ২৪ জুলাই তারিখেও একই পরিমাণ টাকা দিয়ে ইজারার পুনর্নবীকরণ করিয়েছিলেন।১৯৭৫ সাল পর্যন্ত হাট থেকে খাজনা উঠিযে যে টাকা পেতেন তার বেশিরভাগই খরচ করতেন সমাজসেবামূলক কাজে।অকাতরে বিলিয়ছিলেন তাঁর দখলে থাকা প্রচুর জমি। লুকসানে নেপালি মাধ্যমের একটি স্কুল গড়তেও তিনি জমি দান করেন।নন্দলালের পাঁচ ছেলের মধ্যে বর্তমানে জীবিত আছেন দুজন। তাঁদের একজন লালবাহাদুরের দখলে রয়েছে আগুন ঝরানো স্বাধীনতার লড়াইযে এক টুকরো স্মৃতি। সেটাই যে এনআরসি যুদ্ধে তাঁর ও লিম্বু সমাজের ব্রহ্মাস্ত্র মনে করছেন লালবাহাদুর।

ছবি : স্বাধীনতা সংগ্রামীদের বন্ড হাতে লালবাহাদুর।