নাগরিকত্ব প্রমাণে অস্ত্র রাজাকে দেওয়া খাজনার রশিদ 

594

রাঙ্গালিবাজনা : রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায় বলেই দিয়েছেন, তিনি থাকতে রাজ্যে এনআরসি-র সম্ভাবনা নেই।  তবে, এনআরসি-র সিঁদুরে মেঘে ফাইলপত্র হাতড়াচ্ছেন রাজ্যের মানুষ। বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়ের চায়ের দোকানে পর্যন্ত এনআরসি নিয়ে যে ধরনের গরম গরম আলোচনা, তর্কবিতর্ক চলছে তাতে নথিপত্র জোগাড়ে উঠেপড়ে লেগেছেন অনেকেই । প্রয়োজন হলে, এ দেশ তথা রাজ্যের আদি বাসিন্দা হিসাবে  যে কোনো সময় নথি দাখিল করতে পুরোনো বাক্স, ট্রাঙ্ক, আলমারিতে পড়ে থাকা হলদে হয়ে যাওয়া নথিগুলি খুঁটিয়ে দেখছেন অনেকে। কিছুদিন আগেও অযত্নে চৌকির তলায় পড়ে থাকা কাগজগুলি হঠাৎই মহা মূল্যবান হয়ে উঠেছে। এতদিন ধরে যে কাগজপত্রগুলি ঘরের কোণে পড়ে ছিল, সেগুলিই এখন ফাইলবন্দি হয়ে সযত্নে ঠাঁই পেয়েছে আলমারিতে।

বাংলাদেশ  সীমান্ত ঘেঁষা কোচবিহার জেলার দিনহাটার বাসিন্দা রিয়াদ হোসেনের কথাই ধরা যাক। জোতদার ঘরের বর্তমান প্রজন্মের যুবক রিয়াদ জোগাড় করেছেন কোচবিহারের রাজার কাছে দেওয়া জমির খাজনার নথি।  রিয়াদের পূর্বপুরুষ মহম্মদ এসারউদ্দিনের বহু বিঘা জমি ছিল। দেশভাগের সময় প্রচুর জমি চলে যায় পূর্ব পাকিস্তান তথা অধুনা বাংলাদেশে। যে জমিগুলি কোচবিহারের রাজ্যে থেকে যায় সেগুলির নথি এখন সযত্নে সংরক্ষণ করছেন  রিয়াদের পরিবারের লোকজন। রিয়াদ বলেন, ‘এনআরসি হোক বা না হোক, এ ধরনের কাগজপত্র সংরক্ষণ করা যে অত্যন্ত দরকার, তা বুঝতে পেরেছি।’

আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট বীরপাড়া ব্লকের ইসলামাবাদ গ্রামের বাসিন্দা আনোয়ার হোসেনও ছুটোছুটি করছেন ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরে। আনোয়ার বলেন, ‘আমাদের পূর্বপুরুষদের অনেক প্রজা ছিল । তাঁরা আমাদের জমির একাংশ পেয়েছেন । এখন আমাদের জোতদারিও নেই । সে সময়ের প্রজারাও বেঁচে নেই । তবে, তাদের নাতি, নাতির ছেলেরা বেঁচে রয়েছেন। আমাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া জমিতেই পুরুষানুক্রমে বাস করছেন তাঁরা। তাঁরা এখন আমাদের পূর্বপুরুষদের দেওয়া সে সময়ের জমির কাগজপত্র চাইছেন। কারণ, চারিদিকে এনআরসি নিয়ে আলোচনা ও গুজবের জেরে তাঁরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছেন না। তাই চেষ্টা করছি, তাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যোগাড় করে দিতে। আমাদের নিজেদের জমিজমার কাগজপত্র রয়েছে ১৯৩৫ সালের । সেগুলিও গুছিয়ে রেখেছি।’

এনআরসি হোক বা না হোক, কাগজপত্র জোগাড় করে রাখা উচিত, একথা মানছেন অনেকেই। জলপাইগুড়ি জেলার দোমোহানির বাসিন্দা মফিজুল ইসলাম বাড়ির যাবতীয় কাগজপত্র ঘেঁটে পেয়েছেন ব্রিটিশ আমলে কেনা জমির দলিল দস্তাবেজ। ১৯৪৬ সালে তাঁর পূর্বপুরুষদের কেনা জমির দলিলটা হঠাৎ করেই মফিজুলের কাছে হয়ে উঠেছে সাত রাজার ধন। মফিজুল সাহেব বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে আমি তেমন চিন্তা করছি না । কিন্তু এ ব্যাপারে নেতাদের কথাবার্তা শুনে ঘাবড়ে যাচ্ছেন অনেকেই। তাই, পুরোনো সব নথি জোগাড় করছি।’

আলিপুরদুয়ার জেলার মাদারিহাট বীরপাড়া ব্লকের খয়েরবাড়ি গ্রামপঞ্চায়েতের উপপ্রধান প্রদীপ সূত্রধর বলেন, ‘এখন এনআরসি হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তাই, এ বিষয়ে গুজব ছড়ানো বা গুজবে কান দেওয়া কোনোটাই উচিত নয়। তবে, যে কোনো নথিপত্রই গুছিয়ে রাখা ভালো। আমাদের পরিবারের ১৯৫৮ সালে কেনা জমির দস্তাবেজ রয়েছে। তাই, ব্যক্তিগতভাবেও নিশ্চিন্ত রয়েছি।’

ছবি- রাজার আমলে দেওয়া জমির খাজনার নথি ।

তথ্য ও ছবি- মোস্তাক মোরশেদ হোসেন