ফালাকাটা : ১৯৮২-৮৩ সালে অসম থেকে তাড়া খেয়ে ফালাকাটার বংশীধরপুরে শরণর্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। এখন তাঁরা বংশীধরপুর, রাইচেঙ্গা ও কালীপুর গ্রামে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের সংখ্যা প্রায় ১৫ হাজার। দিনমজুর এই পরিবারগুলির অনেকের আত্মীয়স্বজন এখনও অসমে রয়েছেন। অসমের জাতীয় নাগরিকপঞ্জিতে(এনআরসি) নাম না ওঠা আত্মীয় পরিজনরা এখন যোগাযোগ করছেন তাঁদের সঙ্গে।  রাজ্যেও এনআরসি চালু হলে ফের বিপাকে পড়বেন ফালাকাটায় বসবাসকারী অসমের বাসিন্দারা। ১৯৮২-৮৩ সালের  সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা মনে পড়তেই আঁতকে উঠছেন তাঁরা।

দীর্ঘদিন থেকে বসবাসের সূত্রে এখানেই তাঁদের ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড হয়েছে। কিন্তু ১৯৭১ সালের আগের কোনো নথিপত্রই কারো কাছে নেই। এই পরিস্থিতিতে তাঁরা উদবিগ্ন। তবে তাঁদের পাশে থাকার আশ্বাস দিচ্ছেন তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা। অবশ্য এ রাজ্যে এনআরসি হলে ওই বাসিন্দাদের কোনো সমস্যাই হবে না বলে দাবি বিজেপির।

অসমে বাঙালি খেদা আন্দোলনের জেরে ১৯৭৯ থেকে প্রচুর বাঙালি আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহারের বিভিন্ন এলাকায় আসে। তৎকালীন সরকার এই শরণার্থীদের শিবিরে থাকার ব্যবস্থা করে। এভাবেই ফালাকাটার চরতোর্ষা নদীর তীরে বংশীধরপুর গ্রামে বিস্তীর্ণ খাসজমিতে গড়ে ওঠা এক শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিলেন কয়েক হাজার মানুষ। ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে তাঁদের জনবসতি। পাশের রাইচেঙ্গা ও কালীপুর গ্রামেও পরবর্তীতে তাঁরা জমি জায়গা কিনে ঘর বাড়ি করেন। এই গ্রামগুলির মাঝ বরাবর চলে গিয়েছে ফালাকাটা-সোনাপুর জাতীয় সড়ক। অসম থেকে আসা মানুষদের জনবসতির জেরেই রাইচেঙ্গা ও কালীপুর গ্রামের মাঝখানে ‘আসাম মোড়’ নামে একটি বাস স্টপেজ তৈরি হয়।

সম্প্রতি অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর ১৯ লক্ষ মানুষের নাম বাদ যাওয়ায় তার কিছুটা প্রভাব ফালাকাটার আসাম মোড় এলাকাতেও পড়েছে। এখানকার প্রত্যেকের আত্মীয় পরিজন অসমে আছেন, যাঁদের কারো কারো নাম তালিকায় ওঠেনি।  এনআরসিতে নাম না থাকায় পরিজনরা ফালাকাটায় বসবাসকারীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। কেউ কেউ এখানে চলে আসারও ইচ্ছাপ্রকাশ করছেন। তবে এর থেকেও বেশি আতঙ্ক ছড়াচ্ছে এ রাজ্যে এনআরসি চালু হওয়া নিয়ে। শুক্রবার রাইচেঙ্গার ১৩/২২৪ বুথের তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য সুভাষ অধিকারীকে নিজেদের উদবেগের কথা জানান বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা চিত্তরঞ্জন সরকার বলেন, ‘ ১৯৭১ সালের আগের কোনো নথিপত্রই কারো নেই।’ আরেক বাসিন্দা নরোত্তম মজুমদারের কথায়, ‘একবার বিতাড়িত হয়েছি। সেই স্মৃতি ফের তাড়া করছে এখন।’ পঞ্চায়েত সদস্য বলেন, ‘এনআরসি নিয়ে বাসিন্দাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তারা সবাই উদবিগ্ন।’ তৃণমূলের ব্লক কার্যকরী সভাপতি সন্তোষ বর্মন বলেন, ‘আসাম মোড়ের উদবিগ্ন বাসিন্দাদের পাশে আমরা আছি। এনআরসি নিয়ে রাজনীতি শুরু করেছে বিজেপি।’ তবে বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক জয়ন্ত রায় বলেন, ‘এখানে এনআরসি চালু হলেও ওই এলাকার বাসিন্দাদের কোনো চিন্তা নেই। বৈধ শরণার্থী হিসেবে তাদের কোনো সমস্যাই হবে না।’ ফালাকাটার বিডিও সুপ্রতীক মজুমদার এব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।’

ছবি- আসাম মোড়ে উদবিগ্ন বাসিন্দাদের সঙ্গ কথা বলছেন পঞ্চায়েত সদস্য।

ছবি ও তথ্য-সুভাষ বর্মন