নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়  শ্রীরামপুর : জাতীয় নাগরিকপঞ্জি-র (এনআরসি) চূড়ান্ত তালিকায় নাম না থাকায় হতাশ অসমের শ্রীরামপুর এলাকার কিছু বাসিন্দা। কোথাও পরিবারের এক-দুজনের নাম বাদ পড়েছে আবার কোথাও গোটা পরিবারের নামই উধাও। বাদ পড়া বহু পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এনিয়ে উৎকণ্ঠা এবং উদ্বেগের শেষ নেই। তবুও সংবাদমাধ্যমে সেভাবে মুখ খুলতে চাইছেন না কেউই। বিদেশি তকমা সেঁটে ডিটেনশন ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেওয়ার ভয় জাঁকিয়ে বসেছে তাঁদের মনে। সেইসঙ্গে রয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের চোখরাঙানি। তাই ফের উদ্বাস্তু হওয়ার আতঙ্ক বুকে চেপে কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া অসমের অধিবাসীরা। মঙ্গলবার দিনভর নিম্ন অসমের শ্রীরামপুর, গোসাইগাঁও, শিমুলটাপু সহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে অন্তত এমনটাই মনে হল।

অসমের শিমুলটাপু এলাকার গৃহবধূ শীলারানি সরকারের কথায়, কোচবিহার জেলার দক্ষিণ রামপুরে বাপের বাড়ি থেকে ১৯৬৬ সালের ভোটার তালিকা সংগ্রহ করে জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু স্বামী, দুই পুত্র এবং দুই দেওর সহ পরিবারের বাকি সদস্যদের নাম উঠলেও আমার নাম ওঠেনি। ভারতীয় হয়ে সরকারি নির্দেশে নথিপত্র জমা দেওয়ার পর যদি নিজেদের দেশেই বিদেশি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তবে এর চাইতে দুঃখের আর কিছু নেই। স্বামী, দুই পুত্র, আত্মীয়স্বজনদের ছেড়ে আমি কোথাও যাব? নির্দিষ্ট দিনের মধ্যে সঠিক নথিপত্র সহ আবেদন জানানোর পরও যদি ফের ওই কাগজপত্র বাতিল করা হয় তবে ডিটেনশন ক্যাম্পে যাওয়ার বদলে ব্রহ্মপুত্রের জলে ডুবে মরা ছাড়া আমার আর গতি থাকবে না। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে অসম সরকারের ভাবা উচিত। মিঠুনচন্দ্র সরকার নামে আর এক বাসিন্দা বলেন, তালিকায় মায়ের নাম না থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছি। শিমুলটাপু এলাকার বহু মানুষের নাম তালিকায় ওঠেনি। নানা ধরনের দুশ্চিন্তা আর আতঙ্কে রাতের ঘুম উবে গিয়েছে গ্রামজুড়ে। অসম সরকার ঘোষণা করেছিল, ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চের আগে থেকে যাঁরা অসমে বসবাস করছেন তাঁরা ভারতীয়। তাঁদের নাম এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকায় থাকবেই। কেউ বাদ যাবেন না। এমন ঘোষণায় স্বস্তিতেই ছিলেন অনেকে। নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, ১৯৬৪ সালে অসমে আসার পর সরকারিভাবেই থাকার জায়গা, ব্যবসার জন্য টাকার ব্যবস্থা করেছিল। এখানে ৩৩ বছর চাকরি করার পর অবসর নিয়েছি। অসম সরকারের কাছে থেকে পেনশনও পাচ্ছি। আমার ছেলেরও জন্ম অসমে। লেখাপড়া শিখে সরকারের প্রশাসনিক বিভাগে চাকরি করছে। অথচ আশ্চর্যজনকভাবে আমার গোটা পরিবারকেই বঞ্চিত করা হয়েছে। তাই আমি অসম সরকারের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, রিফিউজি কলোনির সমস্ত বাসিন্দাদেরই যেন ভারতীয় হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

বাঙালি জনমুক্তি বাহিনীর অন্যতম নেতা রঞ্জন সরকার বলেন, শ্রীরামপুরের প্রায় ৬০০ জন মানুষের নাম চূড়ান্ত তালিকায় নেই। তাঁদের মধ্যে বহু দিন আনা দিন খাওয়া পরিবার রয়েছে। তাঁদের পক্ষে টাকাপয়সা খরচ করে ফের দলিল দস্তাবেজ সমেত চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের ১২০ দিনের মধ্যে ফরেনার্স ট্রাইবিউনালে আবেদন জানানো এবং দৌড়ঝাঁপ করা কার‌্যত সম্ভব  নয়। তবে অসম সরকার সবরকমভাবে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এনআরসি সংক্রান্ত সমস্যা না মিটলে আমরা সাংগঠনিকভাবে বিক্ষোভ আন্দোলনের পথেই হাঁটব। বিটিসি বেঙ্গলি যুব-ছাত্র ফেডারেশনের কোকরাঝাড় জেলার সাধারণ সম্পাদক কমল ঘোষ বলেন, আমার স্ত্রীর নাম তালিকায় নেই। অথচ ১৯৪৮ সালের জমির দলিল জমা দেওয়া হয়েছিল। এমন ঘটনা বহু পরিবারের ক্ষেত্রেই হয়েছে। এনআরসি-র চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়া ১৯ লক্ষের মধ্যে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ হিন্দু বাঙালি। সমস্যা মেটানোর দাবিতে সারা অসম বাঙালি যুব-ছাত্র ফেডারেশন, বাঙালি ঐক্য মঞ্চ, বাঙালি সুরক্ষা সমিতি, বাঙালি জনমুক্তি বাহিনী সহ অসমের সমস্ত বাঙালি সংগঠনগুলির তরফে দিল্লির য়ন্তরমন্তরে ৫ সেপ্টেম্বর ধরনা দেওয়া হবে। এরপর দেশের প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতির কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এই কর্মসূচিকে সফল করতে অসম থেকে প্রায় ৫ হাজার বঞ্চিত মানুষ দিল্লি যাচ্ছেন।