মেডিকেলের মেঝেতে দিন কাটছে নৃপেনবাবুর

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : একমাত্র ছেলে প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। মেয়ে স্বাস্থ্যকর্মী। ছেলে ও মেয়ে দুজনেই অবস্থাসম্পন্ন। বিবাহসূত্রে মেয়ে এখন রায়গঞ্জ শহর সংলগ্ন চণ্ডীতলা এলাকায় থাকেন। একমাত্র ছেলে পিন্টু পাল বাবার সম্পত্তি নিজের নামে লেখার পাশাপাশি জমানো টাকাও হাতিয়ে নিয়েছে। মাস দুয়েক আগে বাবাকে ডাক্তার দেখানোর নাম করে রায়গঞ্জ মেডিকেলের শল্য বিভাগে ফেলে পালিয়ে যায়। দুমাস ধরে সেখানেই পড়ে রয়েছেন ওই বৃদ্ধ। পরিবারের কেউ তাঁকে দেখতেও আসে না। শারীরিক অবস্থার ক্রমশ অবনতি হয়েছে। হাসপাতালের কিচেন থেকে দেওয়া ভাত খাওয়ার ক্ষমতাটুকুও নেই। যে কোনও সময় মৃত্যু হতে পারে তাঁর।

রায়গঞ্জ শহরের মিলনপাড়া এলাকার বাসিন্দা নৃপেন পাল (৭০)। তাঁর ছেলের এমন কীর্তিতে সবাই বিরক্ত। পাড়ার বাসিন্দারাও ছেলের এই কীর্তিতে রীতিমতো হতবাক। তবুও ছেলে ও মেয়ের কোনও হেলদোল নেই। ওই বৃদ্ধের অভিযোগ, মাস দুয়ের আগে আমাকে ডাক্তার দেখানোর নাম করে ছেলে হাসপাতালে ফেলে দিয়ে চলে গিয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে দিন কাটাচ্ছি। আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি। ভিটেবাড়িটাও ছেলের নামে করে দিয়েছি। ছেলে আমার সব জমানো টাকা হাতিয়ে নেয়। এখন নিজের হাতে খাবার খাওয়ার ক্ষমতাটুকুও নেই। অর্ধাহার ও অনাহারে দিন কাটছে।

- Advertisement -

রায়গঞ্জ শহরের মিলনপাড়ার বাসিন্দা নৃপেন পাল পেশায় ছিলেন দর্জি। ঘড়ি মোড়ে তাঁর দোকান ছিল। সামান্য কিছু জমিও ছিল। এক ছেলে, এক মেয়ে ও স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চালাতে তেমন কোনও কষ্ট হত না। ছেলেমেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়েছেন। স্ত্রী মারা গিয়েছেন বছর দশেক আগে। একমাত্র মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন রায়গঞ্জ শহরের চণ্ডীতলা এলাকায়। ছেলে পিন্টু, বউমা শিবানী ভৌমিক পাল ও নাতিনাতনিকে নিয়ে একসঙ্গেই থাকতেন নৃপেনবাবু। মাস কয়েক আগে বসতবাড়ির ভিটে ছেলে নিজের নামে করে নেয়। বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি ঘরের মধ্যেই শৌচকর্ম করে ফেলতেন। সেই কারণে ছেলে, বাবাকে একাধিকবার মারধর করেছে বলেও অভিযোগ। মাস দুয়েক আগে নৃপেনবাবু কোমরে ব্যথা অনুভব করেন। তাঁকে ডাক্তার দেখানোর নাম করে হাসপাতালের শল্য বিভাগে ভর্তি করে পালিয়ে যায় ছেলে।

নৃপেনবাবু বলেন, দর্জির কাজ করে ছেলেমেয়েকে পড়াশোনা শিখিয়েছি। নিজের পায়ে দাঁড় করিয়েছি। অথচ শেষ বয়সে আমাকে হাসপাতালেই কাটাতে হচ্ছে। কোনও আয়া মাসি মনে করলে খাইয়ে দেয় নচেৎ অর্ধাহারে কিংবা অনাহারে দিন কাটে আমার। কর্তব্যরত নার্সদের বক্তব্য, দীর্ঘ দুতিন মাস ধরে পড়ে রয়েছেন ওই বৃদ্ধ। পরিবারের কোনও খোঁজ নেই। ঘরের মধ্যে শৌচকর্ম করে ফেলছেন। ফলে গন্ধে টেকা দায় হয়ে যাচ্ছে। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যক্ষ প্রিয়ংক রায় বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ৭০ বছরের এক বৃদ্ধ হাসপাতালে পড়ে রয়েছেন। পুলিশকে বিষয়টি জানানো হয়েছে।

এদিকে অভিযুক্ত ছেলে পিন্টু পালের বক্তব্য, ঘরের মধ্যেই শৌচকর্ম করে ফেলেন বাবা। তাই আমাদের পক্ষে তাঁকে দেখা সম্ভব নয়। উত্তর দিনাজপুর জেলা নাগরিক কমিটির সম্পাদক তপন চৌধুরী বলেন, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ এখন বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়েছে। সেখানে পাঁচজন বৃদ্ধ ও তিনজন বৃদ্ধা থাকতেন। হাসপাতালেই ছজনের মৃত্যু হয়েছে। শল্য বিভাগে একজন বৃদ্ধ ও একজন বৃদ্ধা রয়েছেন।

রায়গঞ্জ পুরসভার কাউন্সিলার সাধন বর্মন বলেন, বিষয়টি আমি জানি। সম্প্রতি ওই বৃদ্ধের সঙ্গে আমি দেখা করে এসেছি। ছেলের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করতে বলেছি। তিনি সন্তানদের অনেক কষ্টে মানুষ করেছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই ছেলে তাঁকেই বাড়িছাড়া করেছে। তবুও বৃদ্ধ ছেলের খারাপ চান না। বললেন, ওরা ভালো থাক, ওদের মঙ্গল হোক। ভগবানকে ডাকছি, যাতে তাড়াতাড়ি আমার মৃত্যু হয়।