শিলিগুড়ি : এক দশক ধরে উত্তরের জলাশয়ে দেখা মিলছে না গারগেনি হাঁসের। সময়ে সঙ্গে কমছে পরিযায়ী পাখির প্রজাতির সংখ্যাও। এশিয়ান ওয়াটারল্যান্ড ব্যুরো এবং ওয়াটারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে উত্তরবঙ্গের চারটি জলাশয়ে পাখি গণনার মধ্যে দিয়ে যে তথ্য উঠে এসেছে, তাতে এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ধরা পড়েছে। এই পরিস্থিতির জন্য নদী দূষণের পাশাপাশি জলবাযু পরিবর্তনকে দায়ী করেছেন পরিবেশপ্রেমীরা। পরিস্থিতির পরিবর্তনের জন্য পরিবেশ বাঁচাওয়ে ডাক দিয়েছেন তাঁরা।

পরিবেশের ভারসাম্যর মাপকাঠি নির্ধারণে প্রতিবছরই শীতকালীন পাখি গণনার কাজ হয়ে থাকে গোটা বিশ্বেই। এই বছর হিমালয় সংলগ্ন উত্তরবঙ্গে পাখি গণনার জন্য বেছে নেওয়া হয়েছিল কোচবিহারের রসিক বিল, আলিপুরদুয়ারের নারারথলি, জলপাইগুড়ির গজলডোবা এবং জলপাইগুড়ি ও দার্জিলিং জেলার মধ্যে থাকা ফুলবাড়ি ব্যারেজ। এর মধ্যে তিনটি জায়গাতেই প্রজাতির সংখ্যা গত বছরের থেকে অনেকটাই কমেছে। যেমন, গত বছর গজলডোবায় সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল ৬৮টি প্রজাতির ৭,৯৮১টি পাখির। এই বছর ৬৫টি প্রজাতির ৮,৯৫৪টি পাখির দেখা মিলেছে। এখানে পাখির সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও প্রজাতির সংখ্যা কমেছে। বক্সা সংলগ্ন নারারথলির সঙ্গে এই বছর পাখি গণনার কাজ হয়েছে ছোটা বিল এবং ভইশাডোবা বিলে। এখানে গত বছর ৩৫টি প্রজাতির ১,৩৫৯টি পাখি ছিল। এই বছর তা  ৩৮টি প্রজাতির ১,৩১২টিতে দাঁড়িয়েছে । নারারথলির সঙ্গে এই বছর আরও দুটি বিলকে সংযুক্ত করায় এখানে তিনটি প্রজাতির পাখি বেশি দেখা গিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে পাখির সংখ্যা এখানে অনেকটাই কমেছে।

- Advertisement -

তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, উত্তরবঙ্গে একমাত্র নারারথলিতেই স্পটবিল্ড ডাকের দেখা পাওয়া যেত। কিন্তু এবার দূরবিনেও তা ধরা পড়েনি। দীর্ঘ বছর ধরে পাখি গণনার কাজে যুক্ত গৌতম সাহার বক্তব্য, ‘এই বছর সংলগ্ন এলাকার বনাঞ্চলে পাখি আসার সময়ে গাছ কাটা হয়েছে। তাছাড়া বাঁধে জলও কম ছিল। তাই তুলনামূলকভাবে পাখির সংখ্যা কমেছে।’ রসিকবিলে গত বছর ৫৬টি প্রজাতির ২,৯৪২টি পাখি পাওয়া গিয়েছিল। এবার তা কমে  ৫১টি প্রজাতির ৪,৬৬৩টিতে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, প্রায় ২০ বছর পর এবার ইম্পিরিয়ার ইগলের দেখা মিলেছে। প্রথমবার বুটেড ইগলের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। কচুরিপানা পরিষ্কারের পাশাপাশি মাছ ধরার ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করার জন্য রসিক বিলে পাখির সংখ্যা অনেকটা বেড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ফুলবাড়িতে গত বছর ৫৫টি প্রজাতির ৪,২১৪টি পাখির দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এ বছর সেখানে ৪৯টি প্রজাতির ৪,৩৯২টি পাখির দেখা মিলেছে।

এশিয়ান ওয়াটারল্যান্ড ব্যুরো এবং ওয়াটারল্যান্ড ইন্টারন্যাশনালের তত্ত্বাবধানে উত্তরবঙ্গে পাখি গণনার কাজ করেছে হিমালয়ান নেচার অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার ফাউন্ডেশন বা ন্যাফ। সংগঠনের কোঅর্ডিনেটর অনিমেষ বসুর বক্তব্য, ‘জলবায়ুর পরিবর্তনের পাশাপাশি যাত্রাপথে নানান বিপত্তি ঘটায় প্রজাতির সংখ্যা কমছে বলে মনে হচ্ছে। তবে আরও বেশি সমীক্ষার প্রযোজন রয়েছে।’ বছরের পর বছর ধরে পাখির ছবি ক্যামেরাবন্দি করা পেশায় পুলিশ আধিকারিক অচ্যিন্ত গুপ্ত অবশ্য সংখ্যাতত্ত্বের ওপর নির্ভরশীল নন। তিনি বলেন, ‘সাধারণত যেভাবে গণনা হয়, তাতে প্রজাতির সংখ্যা কমেছে বলা যায় না। কেননা অনেক পাখিই একদিন থেকে উড়ে গিয়ে আবার ফিরে আসে।’