করোনা পরীক্ষা করাতে চাইছে না শিলিগুড়ির নার্সিংহোমগুলি

1270
ছবি: সূত্রধর

শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ির অধিকাংশ নার্সিংহোম রোগীদের এবং নিজেদের কর্মীদের করোনার পরীক্ষা করানোর ব্যাপারে উত্সাহ দেখাচ্ছে না। আর এর জেরেই সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে একাধিক এমন ঘটনা নার্সিংহোমগুলিতে ঘটেছে, যেখানে পরিবারের বা কর্মীদের চাপে পড়ে নার্সিংহোম কর্তপক্ষ করোনার পরীক্ষা করিয়েছে এবং আশঙ্কামতোই রিপোর্ট পজিটিভ এসেছে। জেলার স্বাস্থ্যকর্তাদের একাংশ মনে করছেন, নার্সিংহোমে চিকিত্সাধীন কেউ করোনা সংক্রামিত ধরা পড়লে বা তাঁদের কর্মীদের শরীরে করোনার হদিস মিললে নার্সিংহোমটি সিল করা হতে পারে এমন আশঙ্কা থেকেই নার্সিংহোমগুলি এমন আচরণ করছে। নিজেরা রোগী চিকিত্সার সময় উপসর্গ দেখেও করোনার পরীক্ষা করাতে চাইছেন না। এমনকি নার্সিংহোমে কর্মরত কারও শরীর খারাপ হলে তাঁদের লালার নমুনা পরীক্ষা না করিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওযা হচ্ছে। এর ফলে সংক্রমণের আশঙ্কা বাড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে নার্সিংহোমগুলির ওপর নজরদারি শুরু করতে চলেছে জেলা প্রশাসন। নার্সিংহোমগুলির ওপর নজর রাখার জন্য মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের নেতত্বে বিশেষ মনিটারিং কমিটি তৈরি করা হয়েছে। ওই কমিটি শহরের প্রতিটি নার্সিংহোম ঘুরে দেখবে। পাশাপাশি স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে কোভিড চিকিত্সা সংক্রান্ত একটি গাইডলাইন দেওযা হবে নার্সিংহোমে। প্রত্যেককে সেই গাইডলাইন মেনে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, শুক্রবার রাতে হাকিমপাড়ার যে নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ উঠেছিল তার বিরুদ্ধেও তদন্ত শুরু করেছে জেলা স্বাস্থ্য দপ্তর। দার্জিলিংয়ে জেলা শাসক এস পন্নমবলম বলেন, জেলার মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিকের নেতত্বে মনিটারিং টিম তৈরি করা হয়েছে। এই দল শিলিগুড়ির বিভিন্ন নার্সিংহোমের ওপর নজরদারি চালাবে। শিলিগুড়ি নার্সিংহোম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরফে ডঃ পীযূষ রায় বলেন, দু-একটি ঘটনা সামনে আসছে যেখানে রোগীদের শরীরে উপসর্গ থাকলেও করোনার পরীক্ষা করানো হচ্ছে না কেন তা বলতে পারব না। উপসর্গ থাকলে নিশ্চিতভাবে এই পরীক্ষা করাতে হবে। দার্জিলিংয়ে মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ প্রলয় আচার্য বলেন, শুক্রবার একটি ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগ পেয়ে রোগীর পরীক্ষা করানো হয়েছিল। এমন অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওযা হবে।

- Advertisement -

শিলিগুড়িতে করোনার চিকিৎসা ব্যবস্থা সরকারিভাবে প্রথমদিন থেকেই শুরু হলেও বেসরকারি ক্ষেত্রে অর্থাৎ বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমে এর চিকিত্সা শুরু করতে যথেষ্টই বেগ পেতে হয়েছে প্রশাসনকে। কারণ দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পরও বেসরকারি হাসপাতাল এবং নার্সিংহোমগুলিতে করোনার চিকিত্সা শুরু করা এবং ১০ শতাংশ শয্যা আবশ্যিকভাবে করোনার চিকিত্সার জন্য রাখার নির্দেশিকা জারি করেও এখনও পুরো বন্দোবস্ত করে ওঠা যায়নি। দুতিনটি নার্সিংহোম সরাসরি আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করে করোনার চিকিত্সা করছে ঠিকই, কিন্তু বাকিদের গা-ছাড়া ভাব এখনও রয়েছে। এমনকি করোনার উপসর্গ নিয়ে কোনও রোগী ভরতি হলে তাঁদের লালার নমুনা পরীক্ষা করা নিয়ে টালবাহানা করা হচ্ছে। অভিযোগ, চিকিত্সকরা রোগীকে পরীক্ষা করার পরই করোনা সন্দেহ করলেও তা প্রকাশ্যে বলছেন না বা লালার নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। ফলে ওই রোগীর সঠিক চিকিত্সাই হচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। শিলিগুড়ির বিভিন্ন নার্সিংহোমে গত কয়েকদিনে বেশ কয়েজন রোগীর মৃত্য়ু হয়েছে। তাঁদের প্রত্যেকেই করোনায় সংক্রামিত ছিলেন। কিন্তু সঠিক সময়ে তাঁদের লালার নমুনা পরীক্ষা করানো হয়নি এবং উপযুক্ত চিকিৎসাও হয়নি বলে অভিযোগ। শুক্রবার শহরের দুটি নার্সিংহোমে করোনায় সংক্রামিত হয়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে একটি নার্সিংহোমে ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের এক বাসিন্দার মৃত্যু হয়েছে।

মৃতের আত্মীয় রাজু পাল বলেন, শ্বাসকষ্ট নিয়ে শ্বশুরমশাইকে নার্সিংহোমে ভরতি করেছিলাম। ১০-১১ দিন ওই নার্সিংহোমে তিনি চিকিত্সাধীন ছিলেন। কখনও বলা হয়েছে রোগী ভালো আছেন, কখনও বলা হয়েছে রোগীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হচ্ছে। কিন্তু আমরা বারবার বলেও করোনার পরীক্ষা করাতে পারিনি। নার্সিংহোমের বক্তব্য ছিল, করোনার উপসর্গ নেই। কিন্তু আমরা বারবার বলেছি, রোগীর যে সমস্ত সমস্যা রয়েছে তাতে করোনা হতেও পারে। অবশেষে শুক্রবার সকালে তিনি মারা যান। এরপরই মরদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওযার চেষ্টা হয়। সেই সময় আমরা বাধা দিই। আমাদের বক্তব্য ছিল, লালার নমুনা পরীক্ষা করে তারপরই মরদেহ পরিবারের হাতে দিতে হবে। কিন্তু নার্সিংহোম কর্তৃপক্ষ তাতে রাজি হয়নি বরং একটি রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট আমাদের দিয়ে বলা হয়েছিল, ওঁর শরীরে করোনার জীবাণু নেই। আমরা এরপর জেলা স্বাস্থ্য দপ্তরের দ্বারস্থ হই। তখন মৃতের লালার নমুনা পরীক্ষা করা হয় এবং সন্ধ্যায় রিপোর্ট পজিটিভ আসে। তাহলে ওই মরদেহের লালার নমুনা পরীক্ষা না করিয়ে পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছিল কেন? এর ফলে তো পরিবারের লোকজন সহ আরও অনেকেই করোনায় সংক্রামিত হতে পারতেন। এমনকি যে চিকিৎসকরা এতদিন ওই রোগীর চিকিত্সা করেছেন তাঁরা আরও বহু রোগীর চিকিৎসায় যুক্ত ছিলেন। তাঁদেরই বা কী হবে? এই ঘটনার জেরে সংশ্লিষ্ট নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওযার দাবি তুলেছে মৃতের পরিবার।

শহরের আরও একটি নার্সিংহোমে শুক্রবার এক সিপিএম নেতার মৃত্যু হয়েছে। তাঁর চিকিত্সা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যে নার্সিংহোমে তিনি চিকিত্সাধীন ছিলেন সেখানে সঠিক চিকিত্সা হয়নি এবং চিকিত্সকরা ওই রোগীর শরীরে সংক্রমণ ধরতেই পারেননি বলে সিপিএমের একাংশের অভিযোগ। অন্যদিকে, শহরের বেশকিছু নার্সিংহোমের কর্মীরা সংক্রামিত হতে শুরু করেছেন। সেই নার্সিংহোমে চিকিত্সাধীন কোনও রোগীর করোনায় মৃত্যু হলে তাঁর চিকিত্সায় যুক্ত চিকিত্সক, নার্স এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের কোয়ারান্টিন সেন্টারে পাঠানো বা লালার নমুনা পরীক্ষা করার উদ্যোগ নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ। এক-দুজনের শরীরে জ্বর বা করোনার অন্য কোনও উপসর্গ দেখা দিলে তাঁদের ছুটি দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু উপসর্গ না দেখা দেওযা পর্যন্ত কাজ করানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এভাবেই খালপাড়ার একটি নার্সিংহোমের প্রায় ৯০ শতাংশ চিকিত্সক, কর্মী করোনায় সংক্রামিত হয়েছিলেন। কিন্তু তারপরও একই অবস্থা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।