আমার কথা শোনার লোক কোথায়, আক্ষেপ মালবাজারের সিধুজ্যাঠার

184

বিদেশ বসু, মালবাজার : আপনি সত্যজিৎ রায়ের ভক্ত? তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস, তাঁর বানানো সিনেমা আপনাকে শিহরিত করে এখনও? তাহলে নিশ্চয়ই তাঁর তৈরি চরিত্রগুলির কথা আপনাকে মনে করতে বললে নিশ্চয়ই আপনার স্মৃতির পাতার প্রথমদিকেই থাকবে সিধুজ্যাঠা চরিত্রটি। অশীতিপর সিধুজ্যাঠা যেন জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া। এমন কোনও বিষয় নেই, যা তাঁর অজানা। দেশ-দুনিয়া, রাজ্যের যে কোনও বিষয়, যে কোনও ঘটনা তাঁর ঠোঁটস্থ। আর যদি এমন কোনও ঘটনা ঘটে থাকে, যার মধ্যে চাঞ্চল্যকর উপাদান আছে, তবে তা তাঁর সংগ্রহে অবশ্যই থাকবে। তাঁর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর অসীম জ্ঞানের পরিধিকে সমীহ সম্মান করেন ফেলুদা। দুঁদে গোয়েন্দা ফেলুদা যদি কোনও কেসের ব্যাপারে আটকে যান, বা কোনও তথ্য জানার দরকার পড়ে, তবে তিনি সোজা ছুটে যেতেন সিধুজ্যাঠার বাড়িতে। তাঁর জ্ঞানভাণ্ডারের বিশালতার কারণে অনেকে সিধুজ্যাঠা চরিত্রটিকে বলেন, গুগলের আদি সংস্করণ।

এমন সিধুজ্যাঠারা শুধু সেলুলয়েডের চরিত্র হয়ে থেমে থাকেন না। এই দেশের তল্লাটে তল্লাটে এমন অনেক সিধুজ্যাঠা ছড়িয়েছিটিয়ে আছেন। যদিও এই গুগল যুগে তাঁদের আর কোনও গুরুত্বই অবশিষ্ট নেই। তাঁদের কাছে এখন আর কেউ জানার খিদে নিয়ে ছুটে যান না। তবু অভিজ্ঞতা আর বিপুল প্রজ্ঞা নিয়ে তাঁরা জীবন্ত কিংবদন্তি হয়ে বেঁচে থাকেন। এমনই এক বিরল প্রতিভার মানুষ হলেন মাল শহরের আনন্দপল্লির বিদ্যুৎ সরকার। এখন তাঁর চোখে ছানি পড়েছে। অশক্ত শরীর। বাড়ির চৌহদ্দির বাইরে এখন আর যাওয়াই হয়ে ওঠে না। ঘরে বসে শহরের বিবর্তনের স্মৃতিরোমন্থন করাই এখন তাঁর কাজ। সে বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে ঐতিহ্যবাহী কাহিনী হোক কিংবা ১৯৬৮ সালের বিধ্বংসী বন্যা অথবা হাল আমলের বইমেলার তথ্য। শহরের বিভিন্ন প্রজন্ম তাঁকেই শহরের জীবন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বলে জানেন। শহরের অতীত ইতিহাস নিয়ে প্রশ্ন করলে বিদ্যুৎবাবু শুধু বলেই চলেন। সাত থেকে সত্তর তাঁর দেওয়া তথ্যেই সমৃদ্ধ হন। তাঁর এখন একটাই আফসোস। এখন এই ব্যস্ত যুগে সকলে মোবাইল ফোন আর গুগলে ঝুঁকে। দুদণ্ড কথা শোনার সময় এখন আর কারও নেই।

- Advertisement -

কাগজে-কলমে এখন তিনি ৮৪ বছর। বয়সের নিরিখে শহরে তাঁর থেকেও প্রবীণরা আছেন। তবে একবাক্যে সকলেই স্বীকার করে নেন, শহরের বিবর্তনের ইতিহাস আজও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুকে আগলে রাখার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎবাবু অগ্রজ। অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলায় জন্ম বিদ্যুৎবাবুর। শৈশবে আলমডাঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ে প্রাথমিক পর্যায়ের পড়াশোনা করেছেন। বাবা নিরঞ্জনকুমার সরকার বেঙ্গল ডুয়ার্স রেলওয়ে কর্মচারী ছিলেন। সেই সূত্রেই নিরঞ্জনবাবু ডুয়ার্সে থাকতেন। সময় পেলে  বিদ্যুৎবাবুও শৈশবে মালবাজারে চলে আসতেন। স্বাধীনতার পূর্বেই নিয়মিত যাতায়াত ছিল। ফলে বিদ্যুৎবাবুর বিগত শতকের চারের দশক থেকেই  মালবাজারের জানা-অজানা সমস্ত স্মৃতি এখনও নখদর্পণে। তিনি ১৯৫০ সালে মাল আদর্শ বিদ্যাভবনে ভর্তি হন। তারপর থেকে মালবাজারের জনজীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত থেকেছেন। খেলাধুলা, ক্রীড়া সংগঠন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বন্যাবিধ্বস্ত এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া, শুটিংয়ের দল আসলে তাদেরকে আপ্যায়ন করা প্রভূতি দায়িত্ব থেকে কখনোই পিছপা হননি তিনি। বিদ্যুৎবাবু  অভিনয়ও করতেন। মালবাজার রেফারি অ্যাসোসিয়েশন স্থাপনে অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন। বিভিন্ন স্কুল স্থাপনের ভূমিকা নিয়েছেন।

বয়সের কারণে এখন আর বাড়ি থেকে বেরোতে পারেন না বিদ্যুৎবাবু। তবে বাড়িতে কেউ এলে মালবাজারের অতীত ইতিহাসের নানা পাতা তুলে ধরেন। দেশভাগের সময় থেকে কীভাবে মালবাজারের জনবসতি ও কলেবর বাড়ল, কীভাবে ছোট্ট এলাকা থেকে মালবাজার আজ ডুয়ার্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পরিণত হল সেই কথাগুলি বলে যেন গর্ববোধ করেন তিনি। শৈশবে একসময় মাল শহরে ছিলেন দিকপাল সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। ২০১৭ সালে  মাল শহরে জলপাইগুড়ি জেলা বইমেলার উদ্বোধন এসেছিলেন শীর্ষেন্দুবাবু। তখন শহরে শৈশবের ফেলে রাখা স্মৃতি খুঁজতে বেরিয়ে শীর্ষেন্দুবাবু খোদ বিদ্যুৎ সরকারের কাছে এসে দেখা করে যান। বিদ্যুৎবাবুর স্ত্রী রিনা সরকার বলেন, উনি মানুষের সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পান। মালবাজারের পরিমল মিত্র স্মৃতি মহাবিদ্যালয়ে অধ্যাপক স্বপনকুমার ভৌমিক মালবাজারের নানা দিক তুলে ধরে বই লিখেছেন। স্বপনবাবু বলেন, আমি বিদ্যুৎবাবুকে জীবন্ত ইতিহাস বলেই মনে করি। আমার বই লেখার সময় ওঁর কাছে বারবার ছুটে গিয়েছি। উনি আমাকে সমৃদ্ধ করেছেন। আমার বইয়ের ৫০ শতাংশ তথ্য কার্যত ওঁর থেকেই পাওয়া। বিদ্যুৎবাবু অবশ্য এর জন্য আলাদা কোনও কৃতিত্ব দাবি করেন না। বিদ্যুৎবাবু বলেন, মালবাজার আমাদের প্রাণের শহর। শহরের অতীতের কথা বলে আনন্দ পাই। ভালো লাগে। তবে একটাই আক্ষেপ, এখন ব্যস্ততার যুগ। সকলেই ছুটছে। মোবাইল ফোন আর গুগলে ঝোঁক।  আমার কথা শোনার এখন লোক কোথায়?