নাওথোয়া এখন নাথুয়া, ইছিলামারি পরিচিত ইসলামারি নামে

128

উজ্জ্বল রায়, ধূপগুড়ি : বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নামকরণের মধ্যে লুকিয়ে থাকে সংশ্লিষ্ট স্থানের বৈশিষ্ট্য বা ইতিহাস। নামেই বেঁচে থাকে স্থানের মাহাত্ম্য। উত্তরবঙ্গে অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানে আছে রাজবংশী ভাষার ছোঁয়া। এই ভাষার শব্দভাণ্ডার স্পষ্ট স্থানের নামকরণে। এই নাম ধরেই এলাকার মাহাত্ম্য বা বৈশিষ্ট্য খুঁজে পাওয়া সম্ভব। কিন্তু কালক্রমে উচ্চারণের বিকৃতিতে পালটে যাচ্ছে নামগুলি। এর ফলে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজের এলাকার ইতিহাস অজানা থেকে যাতে পারে। সূত্র হারিয়ে গবেষকরাও অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াবেন। উদাহরণ হিসেবে ময়নাগুড়ির পানবাড়ি এলাকার প্রাথমিক শিক্ষক তপনকৃষ্ণ রায় বলেন, এখানকার একটি জায়গার নাম ইছিলামারি। কিন্তু বর্তমানে অনেকে এলাকাটির নাম ইসলামারি বলে থাকেন। অথচ স্থানীয় ভাষায় ইছিলা কথার অর্থ ছোট চিংড়ি। এই এলাকার একটি নদীতে একসময় ছোট চিংড়ি খুব পাওয়া যেত বলে এই নামকরণ হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ এখানে ছোট চিংড়ি ধরতে  আসতেন। সেজন্য ইছিলামারি নামকরণ হয়েছিল।

আবার বহু বছর আগে ধূপগুড়ির কাছে জলঢাকা, মূর্তি ও ডায়না নদীর সংযোগস্থলের পার্শ্ববর্তী জায়গায় যে সাপ্তাহিক হাট বসত, সেখানে দূরদূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা যেমন গোরুর গাড়ি করে মালপত্র নিয়ে যেতেন, তেমনই ময়নাগুড়ি ব্লকের আমগুড়ি, পানবাড়ি, রামশাই সহ বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষ জলপথে হাটে পৌঁছোতেন। হাটের নাম ছিল নাওথোয়া। নাও অর্থাৎ নৌকা, থোয়া অর্থাৎ রাখা। নৌকা রেখে মানুষ হাটে যেতেন বলে ওই নামকরণ হয়। পরবর্তীকালে উচ্চারণ বিকৃতিতে নাওথোয়া হাটের নাম হয়ে যায় নাথুয়াহাট।

- Advertisement -

এভাবে নাম বদলে যাওয়া স্থানীয় ইতিহাসের সংকট বলে মনে করেন কলকাতার রামমোহন কলেজের অধ্যাপক জগদা রায়। তাঁর বক্তব্য, নাম দিয়ে এলাকার পরিচয় জানা যায়। উচ্চারণের বিকৃতির পাশাপাশি এখন নাম পরিবর্তনের প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। ফলে নামের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জায়গার পরিচয় হারিয়ে যাচ্ছে। কালীরহাট উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাক্তন সহকারী প্রধান শিক্ষক নারায়ণচন্দ্র রায় বলেন, কোচবিহার জেলায় একটি জায়গার নাম শীতলকুচি, যার আদি নাম ছিল শিদলখুচি। শিদল রাজবংশী সম্প্রদায়ের একটি জনপ্রিয় খাবার। শুকনো মাছের একধরনের পদকে শিদল বলে। বহু বছর আগে ওই জায়গায় খুচি নামে একপ্রকার পাত্রে শিদল বিক্রি হত। তাই জায়গাটির নাম ছিল শিদলখুচি। কিন্তু কালক্রমে তা পরিবর্তিত হয়ে শীতলকুচি হয়ে গিয়েছে।

দীর্ঘদিন থেকে এলাকার নামমাহাত্ম্য নিয়ে গবেষণা করছেন ধূপগুড়ির শিক্ষক ডঃ রতনচন্দ্র রায়। তাঁর বক্তব্য, আধুনিকতার প্রভাবে বহু জায়গার নাম পরিবর্তন বা বিকৃত হয়েছে। নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ইতিহাস হারিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ধূপগুড়ির ছোট একটি জনপদের বর্তমান নাম ঠাকুরপাট। পার্শ্ববর্তী একটি জায়গার নাম নিরঞ্জনপাট। সেখানে নিরঞ্জন নামে শিবের পুজো করা হত একসময়। পাট অর্থাৎ গৃহ অথবা মন্দির। প্রচলিত বিশ্বাস হল, নিরঞ্জন যে পথ দিয়ে যাতায়াত করতেন, তাকে ঠাকুরপথ বলা হত। সেই ঠাকুরপথ উচ্চারণ বিকৃতিতে ঠাকুরপাট নামে এখন পরিচিতি পেয়েছে। সমাজকর্মী রণজিৎ রায় বলেন, নামের সঙ্গে কিছু জায়গার ইতিহাস লুকিয়ে থাকে। প্রকৃত নামের পরিবর্তন ঘটলে সেই জায়গার ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। সমাজতত্ত্ববিদ, ভাষাবিদদের তো বটেই, সরকারেরও এ বিষয়ে নজর রাখা উচিত।