স্বপনকুমার চক্রবর্তী, হবিবপুর : মালদার বরেন্দ্রভূমি হবিবপুরের এক প্রত্যন্ত এলাকায় চাষের জমির গর্ভ থেকে একটি পাথরে খোদাই করা একাধিক পৌরাণিক দেবদেবীর মূর্তির উদ্ধারকে কেন্দ্র করে ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। এলাকাবাসীর অনুমান পাথরের মূর্তিটির ওজন প্রায় ১০০ কেজি হবে। মূর্তিটি লম্বায় আনুমানিক ৪ ফুট চওড়া ও ২ ফুট লম্বা। পাথরের মূর্তিগুলি কতটা প্রাচীন তা নিয়ে এলাকায শুরু হয়েছে জোর চর্চা।

গ্রামবাসীদের অনেকের কথায় পাথরে খোদিত রয়েছে শ্রীরামচন্দ্র, সীতা, হনুমান, নৃসিংহদেব এবং বিষ্ণুর মূর্তি। মূর্তিগুলি পাল যুগের বলে ধারণা অনেকের। ইতিহাসবিদদের অনুমান মূর্তিগুলি একাদশ শতাব্দীর। মূর্তিগুলি শুক্রবার উদ্ধার হয়েছে হবিবপুর ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রঞ্জিতপুর এলাকায়। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ প্রশাসন। ততক্ষণে মূর্তি দেখতে ভিড় জমে যায় উৎসাহী মানুষজনের। অনেকেই ভক্তিভরে প্রণাম করতেও ভিড় করেন মূর্তির কাছে। পুলিশ প্রশাসনকে তাঁরা স্পষ্টতই জানিয়ে দেন এই মূর্তি তাঁরা নিয়ে যেতে দিবেন না। গ্রামের দেবতা হিসাবে মূর্তি গ্রামেই থাকবে। এখানেই একটি মন্দির গড়ে প্রতিষ্ঠা হবে মূর্তিগুলির।

স্থানীয অনেক মানুষজনের কথায় তাঁরা বহু আগে থেকেই দেখে আসছেন হবিবপুর ব্লকের শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের রঞ্জিতপুর গ্রামের ওই এলাকায় মাটি অনেকটা উঁচু ঢিপির মতো দেখতে। বংশানুক্রমিকভাবে বর্তমানে ওই উঁচু ঢিপির জমিটিতে চাষবাস করেন গ্রামের রবি মার্ডি। এদিনও তিনি ওই জমিতে টমেটোর চারা লাগানোর জন্য চাষ করছিলেন। হঠাৎই কোদালে শক্ত কিছু লেগে আওয়াজ হয়। মাটি সরাতেই দেখতে পান একটি বড়ো পাথরের মধ্যে খোদাই করা মূর্তির অংশ। উত্তেজনায় তিনি কাঁপতে থাকেন। খবর দেন মানুষজনকে। উৎসাহী মানুষজন ছুটে এসে হাত লাগান মাটি সরাতে। অনেকটা মাটি সরাতেই বেরিয়ে আসে বড়ো পাথরটি। পাথরে খোদিত মূর্তি স্পষ্ট হয় দিনের আলোয়। রাম, সীতা, হনুমান, নৃসিংহদেব এবং বিষ্ণুর মূর্তি বলে গ্রামবাসীরা দাবি করলেও, ইতিহাসবিদরা এখনও সন্দিহান। তারপরই শোরগোল পড়ে যায় এলাকায়। এলকাবাসীর মুখে মুখে ঘুরতে থাকে নানা কাহিনি।

অনেকের দাবি, যেখানে মূর্তি উদ্ধার হয়েছে সেখানে আগে কোনো মন্দির ছিল। সম্ভবত বহু আগে কালাপাহাড়ের হানায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া মূর্তিগুলির কিছু অংশ এগুলি। অনেকের মতে, প্রাকৃতিক কারণেও ধ্বংসাবশেষের অংশ হতে পারে। তবে যাই হোক না কেন, পুলিশ প্রশাসন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও গ্রামবাসীদের অনেকেই পুলিশ প্রশাসনকে জানিয়েছেন, তাঁরা এলাকায় একটি মন্দির করে মূর্তিগুলি প্রতিষ্ঠা করতে আগ্রহী। পুলিশ প্রশাসন অনুমতি বা বাধা কোনোটাই না দিলেও অনেক মানুষজন ইতিমধ্যেই ভক্তিভরে প্রণাম করে মূর্তির কাছে প্রণামীও দিতে শুরু করেছেন।

শ্রীরামপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান পাণ্ডব সিংহ বলেন, শুক্রবার রঞ্জিতপুর এলাকায় রবি মার্ডি নামে এক ব্যক্তি নিজের জমিতে টমেটোর চারা লাগানোর জন্য চাষ করছিলেন। সেসময় মাটির নীচে থেকে একটি বড়ো পাথরের অংশ বেরিযে আসে। উৎসাহী লোকজন খবর পেয়ে ভিড় করেন। উৎসাহীদের সহযোগিতায জমির মালিক মাটি খুঁড়ে পাথরের অধিকাংশটা বের করেন। পাথরটিতে দেখা যায় খোদাই করা কয়েকটি প্রাচীন মূর্তি। খবর পেয়ে পুলিশ প্রশাসন এসে দেখে গিয়েছে। পান্ডববাবু বলেন, মূর্তিগুলি কতদিনের পুরোনো সেটা নিয়ে মানুষজনের মধ্যে নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। হবিবপুরের বিডিও শুভজিৎ জানা বলেন, রঞ্জিতপুর এলাকায় জমি চাষ করতে গিয়ে মূর্তি পেয়েছেন এলাকার লোকজন। মূর্তিগুলি কতটা প্রাচীন এ বিষয়ে সম্পূর্ণ তথ্য না পেলে এখনই কিছু বলা যাবে না।

এদিকে সংশ্লিষ্ট এলাকার শ্রীরামপুর অঞ্চল উচ্চবিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক তথা প্রধান শিক্ষক নিখিলচন্দ্র সাহা বলেন, মালদা জেলাজুড়ে বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে ইতিহাস। বরেন্দ্রভূমি হবিবপুরের মাটি আঁকড়েও রয়েছে ইতিহাসের গন্ধ। এর আগে জগজীবনপুরের লাল মাটির নীচে থেকে উঠে আসা বৌদ্ধবিহার তার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি বলেন, এদিন রঞ্জিতপুর এলাকায় জমি চাষ করতে গিয়ে মাটির নীচ থেকে উঠে আসা প্রাচীন মূর্তি কোন ইতিহাসের সাক্ষ্যবহন করছে কে বলতে পারে। প্রধান শিক্ষক নিখিলবাবু বলেন, তাঁর অনুমান পৌরাণিক দেবদেবীর মূর্তিগুলি একাদশ শতকের। এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের গবেষণা হওয়া দরকার।

তিনি বলেন, এছাড়াও যে এলাকার মাটির নীচ থেকে মূর্তিগুলি পাওয়া গিয়েছে ওই এলাকাটি বহু বছর ধরেই উঁচু ঢিপির মতো দেখতে হলেও কারও মনে কিছু হয়নি। কিন্তু এই মূর্তি উদ্ধারের ঘটনায় সকলের মনে উঁকি দিচ্ছে অন্য ভাবনা। তিনি মনে করেন, ওই উঁচু ঢিপির আকারের দেখতে জমিটা সরকারি উদ্যোগে খনন করার সময় এসেছে। যা পাওয়া গিয়েছে তা হয়তো নমুনা মাত্র। কে বলতে পারে হয়তো কোদালের ফলায় উঠে সূর্যের মুখ দেখার অপেক্ষায় ওই ঢিপির মাটির নীচের অন্ধকারে লুকিয়ে আছে আরও কোনো অজানা ইতিহাস।