ঘরে তিন ছেলে, গাছতলায় দিন কাটছে বৃদ্ধার

179

মালদা : কথায় আছে, ভাগের মা গঙ্গা পায় না। সেটাই যেন বাস্তব হয়ে দাঁড়িয়েছে ইংরেজবাজার পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আশালতা ঘোষের ক্ষেত্রে। তিন ছেলে থাকলেও বছর আশির আশালতাদেবীর বর্তমান ঠিকানা গাছতলা। ঝড়-বৃষ্টি হলে পাড়ারই কোনো বাড়ির বারান্দায় দিন কাটাচ্ছেন তিনি। সরকারি বার্ধক্যভাতার টাকায় নিজের পেটের খাবারটা হয়তো জোগাড় হয়ে যায় কোনোরকমে, কিন্তু বয়সের থাবায় চলাফেরা করাটাই তাঁর সমস্যা। তাই বেশিরভাগ দিনই অর্ধাহারে কাটে। নিজের বাড়িতে আশ্রয় পেতে পুলিশ থেকে স্থানীয় কাউন্সিলারের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। একবার নয়, একাধিকবার। কাউন্সিলারও একাধিকবার তাঁকে বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাঁর ছোটো ছেলে তাঁকে বারবার বাড়ি থেকে তাড়িযে দেয় বলে অভিযোগ ওই বৃদ্ধার। তাই এখন গাছতলা কিংবা প্রতিবেশীদের বাড়ির বারান্দাতেই শুয়ে-বসে দিন কাটে তাঁর। পাড়াপড়শিরা মাঝেমধ্যে তাঁকে এটা ওটা খেতে দেন। নিজের ছেলেদের কথা বলতে গিয়ে বারবার গলা কেঁপে উঠেছে তাঁর।

ইংরেজবাজার পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মহেশপুর তালতলা এলাকার বাসিন্দা আশালতা ঘোষ (৮০)। প্রায় ২০ বছর আগে স্বামীর মৃত্যু হয়েছে। তাঁর তিন ছেলে, এক মেয়ে। বড়ো ছেলে গৌতম ঘোষ কর্মসূত্রে অসমে থাকেন। তবে মেজো ছেলে অনুপম ও ছোটো ছেলে সমীরণ বাড়িতেই থাকে। অনুপম গাড়িচালক। সমীরণ সরকারি দপ্তরের অস্থায়ী কর্মী। সমীরণের আর্থিক অবস্থাই সবচেয়ে ভালো। বিয়ের আগে পর্যন্ত আশালতাদেবী তার কাছেই থাকতেন। তবে বাকি দুই ছেলেও মায়ের দেখাশোনা করতেন। এক বছর আগে সমীরণের বিয়ে হয়েছে। তারপর থেকেই তিনি মায়ের ওপর অত্যাচার শুরু করেন বলে অভিযোগ। আরও অভিযোগ, বৃদ্ধার নামে থাকা সামান্য জায়াগাও তিনি ভুল বুঝিয়ে দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে হস্তগত করেছেন। এরপরেই তিনি মাকে বাড়ি থেকে বের করে দেন। মেজ ভাই অনুপম মাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলে তিনি দাদাকেও বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দেন বলে অভিযোগ। অনুপমের ঘরে ঢুকে তিনি বৃদ্ধার ওপর অত্যাচার করতে শুরু করেন। ছেলের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মেজো ছেলের ঘর থেকে বেরিয়ে রাস্তায আশ্রয় নিতে বাধ্য হন আশালতাদেবী।

শনিবার আশালতাদেবী বলেন, সরকারি প্রকল্পে ঘর পেয়েছি। কিন্তু ছোটো ছেলে আমাকে ভুল বুঝিয়ে আমার নামে থাকা জমি নিজের নামে করে নিয়েছে। বর্তমানে আমার নামে আসা টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পড়ে রয়েছে। ছোটো ছেলে বাড়ি তৈরি করতে না দেওয়ায় সেই টাকা তুলতে পারছি না। ঘর তৈরি করতে না পারলে সেই টাকা ঘুরে যাবে। শুধু তাই নয়, ঘরটা হলে আমি সেখানেই থাকতে পারতাম। এভাবে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতে হত না। ছোটো ছেলের বিরুদ্ধে ইংরেজবাজার থানায় অভিযোগও জানিয়েছি। কিন্তু কোনো সুরাহা হয়নি। এমনকি স্থানীয় কাউন্সিলারও অনেকবার ছোটো ছেলের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবু সে আমাকে বাড়িতে উঠতে দেয় না। তাই আমি আজ গাছতলায়। আমি ছেলের বিরুদ্ধে কিছু বলতে চাই না। কিন্তু আমি বাড়ি ফিরে যেতে চাই। তার জন্য আমি আবার পুলিশ-প্রশাসনের কাছে যাব। প্রয়োজনে আদালতে যেতেও রাজি আছি।

ইংরেজবাজার পুরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার রাজীব চম্পটি বলেন, আমি ওই বৃদ্ধার ছেলেদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা যেন বৃদ্ধা মাকে বাড়িতে আশ্রয় দেয় তার জন্য আবেদন জানিয়েছি। কিন্তু এর বেশি আমিই বা আর কী করতে পারি।