একদা কোচবিহারের ত্রাস, এখনও বিতর্কে ভূষণ সিং

260

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : কোচবিহারের রাজনীতিতে ভূষণ সিং একটা চরিত্র তো বটেই। কখনও নির্দল, কখনও তৃণমূল, কখনও বিজেপিতে যোগদান তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারকে বর্ণময় করে তুলেছে।

সেইসঙ্গে কোচবিহার পুর ভবনের বিক্রি নিয়ে বর্তমানে সেখানকার রাজনীতিতে যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তার কেন্দ্রেও কিন্তু ভূষণই। বয়স ত্রিশ ছুঁতে না ছুঁতেই কোচবিহার পুরসভার কাউন্সিলার পদে প্রথম জয় পেয়েছেন। শিক্ষকতা থেকে শুরু করে নেভি বা পুলিশ অফিসার- পেশাগত দিক থেকে বহু ক্ষেত্রেই তিনি অল্পবিস্তর ঘোরাঘুরি করে ফেলেছেন অল্প বয়সেই। আবার একসময় কোচবিহারের মানুষ তাঁর নাম শুনলেই নাকি ভয় পেতেন। বেশ কয়েকবার জেল খেটেছেন। যদিও ভূষণবাবুর দাবি, সমাজসেবার জন্যই জেল খেটেছেন।

- Advertisement -

ভূষণ সিংয়ের বাবা রামজি সিং পেশায় বড় কনট্রাক্টর ছিলেন। শিলচরে এক বিমান দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল তাঁর। তখন ভূষণ পঞ্চম কী ষষ্ঠ শ্রেণির পড়ুয়া। সংসারে আর্থিক অস্বচ্ছলতা সেভাবে ছিল না ঠিকই, কিন্তু তাঁর মা তারাদেবী সিং যথেষ্ট স্ট্রাগল করেই বড় করে তুলেছিলেন চার ভাইকে। কোচবিহার রামভোলা হাইস্কুলের ছাত্র ভূষণ কমার্স নিয়ে দ্বাদশ শ্রেণি উত্তীর্ণ হন। অল্পবয়সে ভালো ফুটবল খেলতেন। কোচবিহার কলেজে পড়ার সময় থেকেই তিনি কংগ্রেসের ছাত্র পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যান। এরপর কলকাতায় সুরেন্দ্রনাথ কলেজে ল-তে ভর্তি হন। কোচবিহারের নেতা আব্দুল জলিল আহমেদ, মলয় ঘটক, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিকদের সঙ্গে তাঁর পড়াশোনা বলে জানিয়েছেন ভূষণ। কিন্তু ল-এর তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা না দিয়ে তিনি বাড়িতে চলে আসেন। যখন পড়াশোনা করছেন, সেসময়ই ভূষণ বেশ কিছু সরকরি চাকরি পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর প্রাথমিক শিক্ষকতার চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু অল্প মাইনে বলে আর যোগ দিইনি। নেভিতে চাকরি পেয়েছিলাম। কিন্তু জলে কাজ করতে হবে বলে যাইনি। এক পুলিশ সুপার ডেকে পুলিশের চাকরি দিয়েছিলেন। ছয়মাসের ট্রেনিং নিতে কলকাতাও গিয়েছিলাম। তিন মাস ট্রেনিং নেওয়ার পর আর থাকিনি। ভালো লাগেনি।

কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ১৯৮২ সালে কোচবিহার পুরসভা নির্বাচনে শহরের ৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে প্রথম নির্দল প্রার্থী হিসাবে দাঁড়িয়ে জয়লাভ করেন এবং কাউন্সিলার হন। সবমিলিয়ে পুরসভা ভোটে তিনি মোট আটবার দাঁড়িয়েছেন। শুধু একবার ৪ নম্বর ওয়ার্ড মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত হয়ে যাওয়ায় তিনি ৩ নম্বর ওয়ার্ড থেকে দাঁড়ান। সেই একবারই তিনি সামান্য কয়েকটি ভোটের ব্যবধানে হেরেছিলেন। ভূষণবাবুর দাবি, দেড় দশক তৃণমূলের হয়ে কাজ করার পরও দল ছেড়েছেন গুরুত্ব না পেয়ে। শেষের দিকে দলের জেলা নেতৃত্ব তাঁর কাজে সবসময় বাধার সৃষ্টি করতেন। তাঁকে ঠিকমতো কাজ করতে দিতেন না। কোচবিহার পুরসভার চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁকে গুরুত্ব দিতেন না। এমনকি কোচবিহারের রাসমেলা মাঠে দলনেত্রী মমতার জনসভায় তাঁকে মূল মঞ্চে জায়গা পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। সবমিলিয়ে বিধানসভা নির্বাচনের আগে অনেকটা অভিমান থেকেই তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দিয়েছিলেন। কিন্তু বিজেপিতে গিয়ে বুঝতে পারেন যে, এই দলটা তাঁর পক্ষে করা সম্ভব নয়। তাই বিজেপিও ছেড়ে দেন।

দীর্ঘ সময় ধরে কোচবিহারের অধিকাংশ মানুষ ভূষণ সিংয়ের নাম শুনলে ভয় পেতেন। এর কারণ কী? ভূষণবাবুর দাবি, সেসময়ে কোচবিহারে প্রচণ্ড ইভটিজিং হত। দুর্বলের ওপর অত্যাচার হত। এসব ঘটনাকে প্রতিরোধ করার জন্য তিনি ৩০-৪০ জনের একটা টিম করেছিলেন। অন্যায়ে প্রতিবাদ করতেন তিনি। দুষ্কৃতীদের শায়েস্তা করতেন। তাই তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে।

পুরসভার ভবন বিক্রি নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তাতে কিন্তু ভূষণ নিজের অবস্থানে এখনও অনড়। তাঁর দাবি, ওখানে শপিং মল হলে পুরসভার আয় বাড়ত। কর্পোরেট টাইপের অফিস খুলতে চেয়েছিলাম। লুটপাট করার জন্য কিছু করছিলাম না। আর সবাই সব জানে। সবার সামনে বোর্ড মিটিংয়ে এটা পাশ করেছি। কোনও কিছু লুকোচুরি করে করা হয়নি।

একসময় যিনি নাকি একের পর এক চাকরি ছেড়েছেন, সেই ভূষণ কিন্তু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে এখন আর নিশ্চিত নন। তৃণমূল ছেড়েছেন ভোটের আগে। বিজেপি ছেড়েছেন ভোটের পরে। এখন কী করবেন? ভূষণ বলেন, তৃণমূলই করতে চাই। দলকে চিঠি দিয়েছি। নাহলে নিজের ব্যবসাতেই মনোযোগ দেব।