কেন্দ্রীয় সরকারের নজরে এক দেশ এক ভোট

1538

নয়াদিল্লি: ভবিষ্যতে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের অস্তিত্ব আর নাও থাকতে পারে। লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন আলাদাভাবে নাও হতে পারে। এমনকি, এই দুই নির্বাচনের সঙ্গে আয়োজন হতে পারে পঞ্চায়েত ও পুরভোটের। বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার সেই পথেই হাঁটছে। সম্প্রতি এ ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে একটি বৈঠক হয়েছে প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি পি কে মিশ্রের সভাপতিত্বে। বিজেপি প্রথম থেকেই সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে একরকম পদক্ষেপ করার পক্ষপাতী। যে কারণে ইতিমধ্যে এক দেশ, এক র‌্যাশন কার্ড নীতি প্রণয়ন করেছে। এক দেশ, এক জাতি তাদের স্বঘোষিত অবস্থান। মুখে না বললেও এক ভাষা, এক ধর্মের কথা হাবভাবে বোঝানো হয়। এখন এক দেশ, এক ভোটের নীতি চূড়ান্ত করতে চলেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার। বিষয়টি যে আকস্মিক, তাও নয়। বিজেপির ইস্তাহারে যেমন ৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপ ও রামমন্দির নির্মাণ ছিল, তেমনই ছিল এক দেশ, এক নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি। অন্য প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত করার পর এখন বিজেপিশাসিত কেন্দ্রের নজর এক দেশ, এক নির্বাচন ব্যবস্থা কায়েম করার দিকে।

দেশে একসঙ্গে ভোট এবং সব ভোটে একটাই ভোটার তালিকা তৈরির কথা বরাবর বলে এসেছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে বৈঠক সেই নীতি কার্যকর করার লক্ষ্যে আরও একধাপ এগিয়ে দিল নরেন্দ্র মোদি সরকারকে। সূত্রের খবর, প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের উদ্যোগে গত ১৩ অগাস্ট পঞ্চায়েত থেকে লোকসভা পর্যন্ত দেশে প্রতিটি নির্বাচনের জন্য একটাই ভোটার তালিকা তৈরির বিষয় আলোচনা করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হয়েছে। নতুন নিয়ম কার্যকর করতে সংবিধান সংশোধন এবং প্রয়োজনীয় আর যেসব পদক্ষেপ জরুরি, সেসবও আলোচনা হয়েছে ওই বৈঠকে। সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত দুটি বিষয়ে মূলত আলোচনা হয়। বর্তমান নিয়মে দেশের স্থানীয় নির্বাচন অর্থাৎ পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোট প্রক্রিয়ার পুরো দায়িত্ব থাকে রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ওপর। এই স্থানীয় নির্বাচনের জন্য চূড়ান্ত ভোটার তালিকাও তৈরি করে রাজ্য নির্বাচন কমিশন। সেখানে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের হস্তক্ষেপের অধিকার থাকে না। মোদি সরকার এই পদ্ধতিটাই পালটাতে চাইছে বলেই সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

- Advertisement -

মোদি সরকারের লক্ষ্য, সংবিধানের ২৪৩কে এবং ২৪৩জেড-এ অনুচ্ছেদের সংশোধন। ভারতীয় সংবিধানের ২৪৩কে ধারায় পঞ্চায়েত ভোটের কথা বলা হয়েছে। ২৪৩জেড-এ ধারায় রয়েছে পুরসভা নির্বাচন সংক্রান্ত বিষয়। এই দুই ধারা অনুযায়ী  পঞ্চায়েত ও পুরসভার ভোট পরিচালনা ও ভোটার তালিকা তৈরির ভার দেওয়া হয়েছে রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে। আরও বলা হয়েছে, কমিশনের প্রধান অর্থাৎ রাজ্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ করবেন রাজ্যপাল। ২৪৩জেড-এ ধারায় পুর নির্বাচনও একইভাবে পরিচালনার কথা বলা হয়েছে। অভিন্ন ভোটার তালিকা তৈরি করতে হলে এই দুটি অনেুচ্ছদ বদলাতে হবে।

অন্যদিকে, সংবিধানের ৩২৪ (১) অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশনকে রাজ্যের যে কোনও নির্বাচনে তদারকি সহ এমন কিছু ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে যার সঙ্গে আপাত বিরোধ রয়েছে পূর্বে উল্লিখিত দুটি অনুচ্ছেদের। সংবিধানের ওই দুই ধারা সংশোধন করে তৃতীয়টির সঙ্গে মিলিয়ে স্থানীয় নির্বাচনকেও কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের আওতায় আনার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে গত ১৩ অগাস্টের বৈঠক সূত্রে খবর। পাশপাশি রাজ্য সরকারগুলিও যাতে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা ধরে নির্বাচন প্রক্রিয়া পরিচালনার ব্যবস্থা করে, সেজন্য রাজ্যগুলিকেও আর্জি জানানো হবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।

গুরুত্বপর্ণ ওই বৈঠকে হাজির ছিলেন ক্যাবিনেট সচিব রাজীব গৌবা, আইনসভার সচিব জি নারায়ণ রাজু, পঞ্চায়েতরাজ সচিব সুনীল কুমার এবং সেক্রেটারি জেনারেল উমেশ সিনহা সহ নির্বাচন কমিশনের তিন প্রতিনিধি। এই মুহূর্তে দেশের বেশিরভাগ রাজ্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা ধরে স্থানীয় নির্বাচন পরিচালনা করলেও উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, ওডিশা, অসম, মধ্যপ্রদেশ, কেরল, অরুণাচলপ্রদেশ, নাগাল্যান্ড এবং কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীর নিজেদের ভোটার তালিকা ব্যবহার করে। সব রাজ্যই যাতে কেন্দ্রীয় ভোটার তালিকা ধরে নির্বাচন করে, সে ব্যাপারে ঐকমত্য তৈরির ভার দেওয়া হয়েছে ক্যাবিনেট সচিবকে।

২০১৪ সালে প্রথমবার কেন্দ্রে ক্ষমতায় আসার পর বিজেপি এই এক দেশ এক ভোট-এর তত্ত্ব সামনে এনেছিল। পঞ্চায়েত-পুরসভা থেকে শুরু করে বিধানসভা ও লোকসভা ভোট- সব একসঙ্গে পাঁচ বছরে একবার একসঙ্গে করার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নিজেই। প্রধানমন্ত্রীর যুক্তি ছিল, এই প্রক্রিয়া কার্যকর করা হলে নির্বাচনে বিপুল খরচ কমবে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচনের আগেও সারাদেশে একটিই ভোটার তালিকা তৈরির পক্ষে প্রচার চালিয়েছিল বিজেপি। তাদের দাবি, সারাদেশে একটাই ভোটার তালিকা থাকলে ভোটে কারচুপি ও জালিয়াতির সম্ভাবনা কমে যাবে। বিরোধীদের অভিযোগ, রাজ্য নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা খর্ব করে রাজনৈতিক শক্তি আরও কেন্দ্রীভূত করতে চাইছে বিজেপি। এর আগে লোকসভা ও বিধানসভা ভোট একসঙ্গে করার পক্ষে নরেন্দ্র মোদি সরব হলেও বিরোধীদের অধিকাংশই তাঁকে সমর্থন করেনি। এবারেও ঐকমত্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। সেক্ষেত্রে সংবিধান সংশোধনে সংসদে তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়তে হবে কেন্দ্রীয় সরকারকে।