অনলাইন ক্লাস কার্যত বন্ধ, পড়াশোনা আর নেই চা বাগানে

47

শুভজিৎ দত্ত, নাগরাকাটা : গতবছর যাও বা ছিল, এবার পডুয়াদের অনলাইন ক্লাস কার্যত বন্ধই হয়ে গিয়েছে। শহরকেন্দ্রিক হাতেগোনা দু-একটি স্কুলে এই ব্যবস্থা চালু থাকলেও জলপাইগুড়ি জেলার গ্রামীণ ও চা বাগান অধ্যুষিত এলাকার লক্ষাধিক স্কুল পড়ুয়া কোনও ধরনেরই পড়াশোনার মাধ্যম না পেয়ে বর্তমানে সম্পূর্ণ দিশাহীন। রাজ্যের উদ্যোগে টেলিভিশনে পড়াশোনার একটি কর্মসূচি নেওয়া হলেও বর্তমানে সেটিও বন্ধ। এদিকে, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর পর ইতিমধ্যেই পাঁচ মাস পেরিয়ে গিয়েছে। বই-খাতা কিংবা মাসে মাসে মিড-ডে মিলের সামগ্রী মিললেও আসল লেখাপড়াটাই না হওয়ায় অভিভাবকরা চিন্তিত। শিক্ষা আধিকারিকরাও সমানভাবে চিন্তিত।

সমগ্র শিক্ষা অভিযানের জলপাইগুড়ির শিক্ষা আধিকারিক মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রছাত্রীদের জুন মাসের মিড-ডে মিলের সঙ্গে মডেল অ্যাক্টিভিটি টাস্ক দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সমাধান করা ওই টাস্ক পরের মাসের মিড-ডে মিলের সামগ্রী বণ্টনের সময় অভিভাবকদের মাধ্যমে স্কুলগুলি জমা নেবে। এতে পড়ুয়ারা পড়াশোনার মধ্যে থাকতে পারবে। স্কুলগুলি বাংলার শিক্ষা পোর্টাল থেকে এই টাস্ক প্রিন্ট করে নেবে। এই বাবদ যা খরচ হবে তা কম্পোজিট গ্রান্টের তহবিল থেকে প্রধান শিক্ষকরা খরচ করতে পারবেন। ২০২০-২১ আর্থিক বর্ষের কম্পোজিট গ্রান্টের বরাদ্দ স্কুলগুলি যাতে দ্রুত পায়, সে বিষয়ে পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে মানবেন্দ্রবাবু জানান। জলপাইগুড়ির জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (মাধ্যমিক) বালিকা গোলে বলেন, সমস্যা মেটাতে পরিকল্পনা করে পদক্ষেপ করা হবে।

- Advertisement -

২০২০ সালের মার্চ থেকে বন্ধ থাকার পর এবছরের ফেব্রুয়ারিতে নবম থেকে দ্বাদশ শ্রেণিকে দিয়ে স্কুলের পঠনপাঠন শুরু হয়। দুমাস ক্লাস হওয়ার পর প্রথমে বিধানসভা ভোট ও পরে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ এসে যাওয়ায় গ্রীষ্মের ছুটি এগিয়ে নিয়ে আসা হয়।   এতে স্কুলগুলিতে ফের তালা ঝোলে। গত ১৫ মাসে প্রথম-অষ্টম শ্রেণির পড়ুয়ারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ১,২০৭টি প্রাথমিক স্কুলে ১ লক্ষ ৭ হাজারের কিছু বেশি পড়ুয়া রয়েছে। ৩৪১টি উচ্চপ্রাথমিক স্কুলে ১ লক্ষ ১০ হাজারের বেশি পড়ুয়া পড়াশোনা করে। এসএসকে-এমএসকে, এনসিএলপি ও মাদ্রাসার মতো ৭০৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পড়ুয়ার সংখ্যা ৩৬,৭০২। এগুলির বেশিরভাগই গ্রামীণ, বনবস্তি ও চা বাগান এলাকায় রয়েছে।

বানারহাট হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সুকল্যাণ ভট্টাচার্য বলছেন, ডুয়ার্স এলাকার বহু ছাত্রছাত্রীর বাড়িতেই অনলাইন ক্লাস করার মতো মোবাইল ফোন নেই। নাগরাকাটা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক পিনাকী সরকারের কথায়, শিক্ষকদের একাংশের অনীহার জেরেও অনলাইন ক্লাসে সমস্যা তৈরি হয়েছে। কুর্তি চা বাগানের অভিভাবক জয়পাল হেলা নামে বলেন, হাতে মোবাইল থাকলে পড়ুয়াদের মধ্যে কিছু নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি হলেও যখন ক্লাস চলত তখন কিন্তু ওরা তাতে শামিল হত। অ্যাসোসিয়েশন ফর হেডমাস্টারস অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেস ফোরামের জেলা কমিটির সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা চক্রবর্তী বলেন, সহ শিক্ষকদের যে অনলাইনে ক্লাস নিতে বলা হবে, শিক্ষা দপ্তরের তরফে এমন কোনও নির্দেশিকা নেই। তবে পড়ুয়াদের স্বার্থে আমাদের ভাবনার সময় এসেছে।

সিপিএম প্রভাবিত শিক্ষক সংগঠন এবিটিএর জেলা কমিটির সম্পাদক প্রসেনজিত্ রায়ের বক্তব্য, গতবছর মিড-ডে মিলের সামগ্রীর সঙ্গে পড়ুয়াদের দু-তিনবার অ্যাক্টিভিটি টাস্ক দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এই ব্যবস্থাই অনেক বেশি কার্যকরী হবে। পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির জেলা কমিটির সভাপতি নির্মল সরকার বলেন, কীভাবে পড়ুয়াদের পাশে দাঁড়ানো যায়, সে বিষয়ে আমরা ভাবনাচিন্তা করছি। পশ্চিমবঙ্গ তণমূল মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির জেলা কমিটির আহ্বায়ক অঞ্জন  দাস বলেন, প্রতিটি স্কুলেরই একটি রুটিন রয়েছে। সেই অনুযায়ী অনলাইন ক্লাসের ব্যবস্থা যাতে ফের চাঙা করা যায়, তা দেখতে কর্তপক্ষগুলিকে অনুরোধ করছি।