কংগ্রেসকে ঘাড়ে নিতে দ্বিধায় ভুগবে বিরোধীরা

তেজস্বী যাদব নিঃসন্দেহে উপলব্ধি করতে পারছেন, কংগ্রেসকে ৭০টি আসন ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে ভুল হয়েছেদেশের বিজেপি বিরোধী যে দলগুলি মহাজোটের পক্ষপাতী, তারাও এরপর মহাজোটে কংগ্রেসকে রাখলেও রাহুল গান্ধি প্রমুখের দাদাগিরি ছড়ি ঘোরানোর মানসিকতা মেনে নেবে কি না সন্দেহলিখেছেন নবেন্দু গুহ

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত বিহার বিধানসভা নির্বাচন শেষে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তরফে যে এগজিট পোল করা হয়েছিল, তা থেকে বহুজনের মনে এমন ধারণা প্রোথিত হয়েছিল যে নীতীশ কুমারের রাজ্যে এবার পালাবদল ঘটবে। এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে গিয়েছিল যে, নীতীশ কুমার আর ক্ষমতায় ফিরছেন না। নীতীশ কুমারের বহুচর্চিত সুশাসনের অবসান ঘটবে, এমন ভবিষ্যদ্বাণীও করা হয়েছিল। লালুপ্রসাদ যাদবের কনিষ্ঠ পুত্র তেজস্বী যাদব নির্বাচনি প্রচারে যে তেজ প্রকাশ করেছিলেন, তাতে এই ধারণাটা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল যে, এবার বিহারে ক্ষমতায় আসছে আরজেডি-কংগ্রেস-বামেদের জোট এবং মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হবেন তেজস্বী। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পর দেখা গেল, আরজেডি-কংগ্রেস-বামেদের নেতত্বে মহাজোট জোরদার লড়াই করলেও শেষমেশ পিছিয়ে পড়ল।

- Advertisement -

তেজস্বীর পক্ষে এ যাত্রায় মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসা হয়ে উঠল না। তবে এটা ঘটনা যে, বিহারে এবার আসনপ্রাপ্তির নিরিখে ৭৫ জন বিধায়ককে নিয়ে একনম্বরে রয়েছে তেজস্বীর আরজেডি। এটাও ঘটনা যে, বেশ কিছু আসনে খুব কম ভোটের ব্যবধানে হারতে হয়েছে আরজেডি প্রার্থীদের। একটু এদিক-ওদিক হলেই গণনা পরবর্তী পরিস্থিতি পালটে যেতে পারত। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, যতই গালমন্দ করা হোক, যতই সমালোচনা করা হোক না কেন, আমাদের দেশে রাজনৈতিক প্রচারের ময়দানে এখনও মেগাস্টারের তকমা পেতে পারেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিই। কার্যত, মোদির হাত ধরেই বিহারে এনডিএ ফের ক্ষমতায় ফিরল। এই সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই।

নীতীশ কুমারের দল জেডিইউ মাত্র ৪৩টি আসনে জয়লাভ করলেও বিজেপির প্রাপ্ত ৭৪টি আসনের সুবাদে নীতীশ ফের মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পেরেছেন। যদিও সমস্যা মাথায় নিয়ে তাঁকে ক্ষমতায় আসীন হতে হয়েছে। অধিক সংখ্যক বিধায়ক থাকায় বিজেপি নেতৃত্ব তাঁকে দুজন উপমুখ্যমন্ত্রী দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। বিধানসভার অধ্যক্ষের পদটিও বিজেপি নিজের হাতে রেখে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করবে সন্দেহ নেই। শুধু মহারাষ্ট্রের অভিজ্ঞতাকে মাথায় রেখে এবং এনডিএর অন্য শরিকদের কাছে নিজের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণে আপাতত নীতীশ কুমারকে গিলতে হল বিজেপিকে। শিবসেনার বিদ্রোহে মহারাষ্ট্রের সরকার হাতছাড়া হওয়ার পর রাজনীতিতে ডিগবাজিতে সিদ্ধহস্ত নীতীশ কুমারকে বেজার করার ঝুঁকি নিতে বিজেপি নেতত্ব আর সাহস পেলেন না।

তাছাড়া এনডিএ এখন কিছুটা ভাঙা হাটের চেহারা নিয়েছে। শিবসেনা, অকালি দলের মতো দীর্ঘদিনের শরিকরা জোট ছেড়ে বেরিয়ে গিয়েছে। অন্য শরিকরা আর যাতে সন্দেহের চোখে না দেখে, সে কারণে এই পদক্ষেপ করা ছাড়া বিজেপির সামনে আর কোনও পথ ছিল না। তাই অনেক কম আসন পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী পদে বসার সুযোগ পেলেন জেডিইউ সুপ্রিমো নীতীশ কুমার। আর ভোটে লড়বেন না বলে নির্বাচনি প্রচারের শেষ লগ্নে তাঁর রাজনীতিতে সন্ন্যাস নেওয়ার বার্তা যে নিছকই কৌশল ছিল, তা স্পষ্ট এখন। একথা ঠিক, বিহারে জেডিইউ এখন ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। আসনসংখ্যা যেমন কমেছে, ভোটের হারও তেমনই কমেছে অনেকটা। অন্যদিকে, আসনপ্রাপ্তির দিক থেকে আরজেডির ঠিক পরেই বিজেপির স্থান হলেও গত লোকসভা নির্বাচনে ভোটের ধরে রাখা তো দূরের কথা, বরং অনেকটা কমে গিয়েছে।

এটা ঘটনা যে, তেজস্বী যাদবের ঝোড়ো প্রচার এবারের বিহার নির্বাচনে আরজেডিকে অনেকটাই এগিয়ে রেখেছিল। বিহারে চিরপরিচিত জাতপাতের সমীকরণের বদলে তেজস্বীর প্রচারে প্রাধান্য পায় কর্মসংস্থান, রোটি-কাপড়া-মকানের প্রসঙ্গ। সেই সুবাদেই আরজেডির ৭৫টি আসনপ্রাপ্তি ঘটেছে। সিপিআই (এমএল) লিবারেশন, সিপিএম এবং সিপিআই যথেষ্ট ভালো ফল করলেও তেজস্বীকে বাস্তবে ডুবিয়েছে কংগ্রেস। বিহার বিধানসভা নির্বাচনে ৭০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে কংগ্রেস জিতেছে মাত্র ১৯টিতে। অথচ ২০১৫ সালে আগেরবারের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ৪১টি আসনে লড়াই করে ২৭টিতে জিতেছিল। এবার ২৯টি বেশি অর্থাৎ ৭০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল কংগ্রেস। কিন্তু দলের বিধায়ক সংখ্যা আরও কমে হয়েছে ১৯। অর্থাৎ কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে মহাজোট তৈরি করে বিহারে তেজস্বী যাদব নিঃসন্দেহে উপলব্ধি করতে পারছেন যে, কংগ্রেসকে এবার ৭০টি আসন ছেড়ে দেওয়া সবচেয়ে ভুল হয়েছে।

শুধু তেজস্বী নন, দেশের বিজেপি বিরোধী যে দলগুলির নেতারা মহাজোটের পক্ষপাতী, তাঁরাও নিশ্চয়ই এরপর গভীরভাবে মাথা ঘামাবেন এবং মহাজোটে কংগ্রেসকে রাখলেও রাহুল গান্ধি প্রমুখের দাদাগিরি ও ছড়ি ঘোরানোর মানসিকতা মেনে নেবেন কি না সন্দেহ। এটা ঘটনা যে, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক আসরে কংগ্রেসের একেবারে বেহাল অবস্থা। আসলে শতাব্দীপ্রাচীন এই দলটিকে যথাযথ নেতৃত্ব দেওয়ার মতো কেউ নেই। একসময় দেশজুড়ে কংগ্রেসের যে ব্যাপক দাপট ছিল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে জায়গা করে নিতে পেরেছিল, বেশ কিছুকাল যাবৎ তার আর কোনও অস্তিত্ব নেই বললেই চলে। বাস্তবে কংগ্রেসের অস্তিত্বই এখন সংকটে।

শুধু বিহার বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের পরিপ্রেক্ষিতে নয়, মধ্যপ্রদেশ, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট সহ বিভিন্ন রাজ্যে সদ্য অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের ফলাফল দেখলে স্পষ্ট বোঝা যাবে, কংগ্রেস কার্যত কী অবস্থায় রয়েছে। বিভিন্ন রাজ্যে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী মোট ৫৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ৪২টিতে। আর কংগ্রেসের ঝুলিতে গিয়েছে মাত্র ১০টি আসন। এর মধ্যে মধ্যপ্রদেশে ২৮টি আসনের মধ্যে বিজেপি জিতেছে ২১টি আসনে। উত্তরপ্রদেশে ৭টির মধ্যে ৬টি আসনে জিতেছে বিজেপি। গুজরাটে ৮টি আসনই গিয়েছে বিজেপির দখলে। কর্ণাটকে ২টি আসনেই জয়লাভ করেছে বিজেপি। অর্থাৎ দেখা যাচ্ছে, প্রায় সর্বত্র বিজেপির জয়জয়কার। আর উলটোদিকে ভরাডুবি অবস্থা কংগ্রেসের। শুধু নিজেরাই ডুবছে তা নয়, বিহারে মহাজোটে শামিল হয়ে গতবারের তুলনায় অনেক বেশি আসনে লড়াই করে এবং একের পর এক আসনে হেরে শুধু নিজেদের অস্তিত্ব সংকটে ফেলেনি, তেজস্বীর মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পেরেছে কংগ্রেস।

তৃণমূল কংগ্রেস সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুকাল যাবৎ মহাজোট গঠন করে বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দলের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলে আসছিলেন। এ ব্যাপারে দুচারটি সভা এবং বৈঠকও হয়েছিল মমতার উদ্যোগে। কার্যত এই মহাজোটের নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন মমতা। কিন্তু শেষমেশ মমতা কথিত মহাজোট বাস্তবে গঠন হয়ে ওঠেনি। সেটা না হওয়ায় নিশ্চয়ই নিজস্ব চিন্তাভাবনা অনুযায়ী কাজ করতে পারছেন তিনি। কংগ্রেসকে নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, সোনিয়া বলুন কিংবা রাহুল, অন্যের কাঁধে চেপে বসতেই বেশি আগ্রহী এই দলটা। বাস্তবে এর ফলে অন্যান্য দলের কাছে কংগ্রেস বোঝা হয়ে থেকে যায়। এই বোঝা কতটা ভারী, তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে পারছেন তেজস্বী যাদব।

এখন নিশ্চয়ই তেজস্বী ভাবতে শুরু করেছেন যে, কংগ্রেস নামক বোঝা কাঁধে নেওয়ার কারণে তাঁর স্বপ্নপূরণ হল না। লক্ষ্যের সামান্য আগে আটকে গেল তাঁর জয়যাত্রা। সামগ্রিকভাবে এনডিএর সঙ্গে মহাজোটের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যার ফারাক মাত্র ১২ হাজার। সংসদীয় রাজনীতিতে নিছক সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে ভোট বৈতরণি পার হয়ে গেল এনডিএ। আগামী বছর পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন। কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে লড়বে সিপিএম। ফলাফল নিয়ে তাই আশান্বিত হওয়ার কোনও কারণ অন্তত এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে না। ভাগ্যিস, কংগ্রেসকে কাঁধে তুলে নেয়নি তৃণমূল কংগ্রেস। বোঝা বহনের চেয়ে একলা চলা অনেক নির্ঝঞ্ঝাট।