সাগর বাগচী, শিলিগুড়ি, ৮ জুলাই : কলেজগুলিতে নতুন ছেলেমেয়েরা পা রাখতেই ক্যাম্পাসের ভেতর ছাত্র সংসদের নামে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে বহিরাগতরা। শিলিগুড়ি কলেজ, সূর্য সেন কলেজ, মুন্সী প্রেমচাঁদ কলেজের মতো শহরের একাধিক কলেজে বহিরাগতদের এই দাপাদাপি লক্ষ করার মতো। এই বহিরাগতদের অনেকে ওই কলেজগুলিরই প্রাক্তন পড়ুয়া, অনেকের সঙ্গে আবার কলেজের সম্পর্কই নেই। কিন্তু ছাত্র সংসদের সদস্য বা প্রাক্তন পড়ুয়া হওয়ার অজুহাতে কলেজের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাচ্ছে ওই বহিরাগতরা। কলেজের পড়ুয়াদের যেখানে পরিচয়পত্র ছাড়া কলেজে ঢুকতে দেওয়া হয় না সেখানে কলেজের নিরাপত্তারক্ষীদের সামনেই বুক ফুলিয়ে বাইক, স্কুটার নিয়ে ঢুকছে বহিরাগতরা। বিষয়টি নিয়ে কলেজগুলির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তিন বছরের বেশি সময় ধরে রাজ্যের কলেজগুলিতে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। তিন বছর আগে যে পড়ুয়ারা বিভিন্ন কলেজের ছাত্র সংসদে বিভিন্ন পদ পেয়েছিলেন তাঁরাই এখনও দায়িত্বে রয়েছেন। কলেজে পড়াশোনার পাট চুকে গেলেও বহালতবিয়তে ছাত্র সংসদ সামলাচ্ছেন তাঁরা। সাধারণ সম্পাদক থেকে শুরু করে সাধারণ সদস্যরা এখনও কলেজগুলিতে সর্বেসর্বা। কলেজে নতুন ভরতি হওয়া ছাত্রছাত্রীদের ক্লাস কোথায় হবে, কোন শিক্ষকের কাছে পড়তে হবে বা কলেজে ফ্রেশার্স বা সোশ্যাল কোথায়, কীভাবে হবে তা ঠিক করে দেন তাঁরাই। দলের মিছিলে না গেলে ফল ভালো হবে না বলে হুঁশিয়ারিও শুনতে হয় ওই বহিরাগতদের থেকে। গত কয়েক বছরে এই বহিরাগতদের বিরুদ্ধে কলেজে ভরতির জন্য মোটা টাকা নেওয়ার অভিযোগও উঠেছিল। এবার পুরো ভরতি প্রক্রিয়া অনলাইনে হওয়ায় টাকা নেওয়ার অভিযোগ সেভাবে ওঠেনি।

শিলিগুড়ি কলেজে তিন বছর আগে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়। কলেজ পাস করে বেরিয়ে গেলেও এখনও সাধারণ সম্পাদকের পদে অভিজিৎ রয়ে গিয়েছেন। কলেজের যেকোনো বিষয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে আলোচনার ক্ষেত্রে অভিজিৎ বারবার দেখা যায়। বহিরাগত হওয়ার পরেও কীভাবে অভিজিৎ কলেজের বিষয়ে নাক গলাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এই বিষয়ে অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, তিন বছর ধরে কলেজে নির্বাচন হয়নি। সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকেও সরে যাওয়ার কোনো নির্দেশ আসেনি।

বিষয়টি নিয়ে শিলিগুড়ি কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ সুজিত ঘোষ বলেন, যারা পাস করে ইতিমধ্যে কলেজ থেকে বেরিয়ে গিয়েছে তারা বহিরাগত। তারা ইচ্ছেমতো কলেজে প্রবেশ করতে পারে না। এমন কেউ কলেজে প্রবেশ করছে বলে আমার জানা নেই। কলেজে ভরতির পুরো প্রক্রিয়াটি অনলাইনে হচ্ছে। তাই ভরতি প্রক্রিয়ায় কেউ প্রভাব ফেলতে পারবে না। আমাদের কলেজে ঢোকার মুখে পুলিশ থাকছে। তাছাড়া নতুন ছাত্রছাত্রীদের এখনও কলেজের ড্রেস হয়নি। তাই তাদের পরিচয় খতিয়ে দেখে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, যারা কলেজ সংসদের দায়িত্বে ছিল, তারা পাস আউটের পরও ওই দায়িত্বে থাকতে পারে কিনা, তা আমার জানা নেই। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কথা বলব। প্রয়োজনে প্রিন্সিপাল কাউন্সিলের সঙ্গে কথা বলব। আর কলেজে নির্বাচনের বিষয়টি রাজ্য সরকার ঠিক করে। নতুন করে ছাত্র সংসদ হয়নি। তবে ছাত্র সংসদের কেউ সেভাবে কলেজে প্রবেশ করে না।

শিলিগুড়ি সূর্য সেন কলেজেও কয়েক বছর ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয়নি। তবে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে সেখানে পুরোনো ছাত্র সংসদটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ, কলেজের ছাত্র সংসদের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক গোপাল সরকার নিজেকে এখনও সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে কলেজে আসছেন। কলেজের ভিতর বিভিন্ন জাযগায় তাঁকে দেখা যায়। তবে বিষয়টি নিয়ে গোপাল সরকারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। সূর্য সেন কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ প্রণবকুমার মিশ্র বলেন, অনেকেই ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে অভিভাবক বলে কলেজে ঢুকছে। তাই সবাইকে আটকানো যায় না। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা আগের ছাত্র সংসদ ভেঙে দিয়েছি। পুরোটাই করা হয়েছে উত্তরবঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্দেশে। এখন কেউ নিজেকে কলেজের সাধারণ সম্পাদক পরিচয় দিয়ে কলেজের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।

মুন্সী প্রেমচাঁদ কলেজের অধ্যক্ষ ডঃ দিলীপকুমার দাস বলেন, আমাদের কলেজে এমনিতেই ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কম। তাই সেভাবে কেউ কলেজে আসে না। তবে আমরা নজরে রাখছি। কোনো বহিরাগত কলেজের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।