রণজিত্ বিশ্বাস, রাজগঞ্জ : বিদেশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী পদম বাহাদুর ছেত্রাী এখন নিজের জীবনের সঙ্গে লড়াই করছেন। তাঁর এই বর্তমান যুদ্ধে অবশ্য পাশে দাঁড়ায়নি কেউ। বেলাকোবার ৮৪ বছরের বৃদ্ধ পদম বাহাদুরের স্ত্রী নেই। জোটেনি বৃদ্ধভাতা এবং আবাস যোজনা প্রকল্পের ঘর। কিন্তু তাতে তাঁর কোনো আক্ষেপ নেই। তবে রাষ্ট্রপতির কাছ থেকে সাহায্য পেলে স্কুল গড়ার ইচ্ছা আছে তাঁর। বেশ কয়েক বছর ধরে বেলাকোবার হরিমন্দিরের পাশে এক ব্যক্তির বাড়ি পাহারা দেওয়ার বিনিময়ে জুটেছে একটু আস্তানা। রাস্তার পাশে একটা টেবিলে তাঁর জল-বিস্কুটের দোকান। সেই দোকানের উপর নির্ভরশীল তাঁর একার সংসার। মৃদুভাষী পদমের ঘরে ভারতের জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি। ঘর এবং হরিমন্দিরই তাঁর সারাদিনের গণ্ডি।

পদম জানিয়েছেন, ১৯৩৫ সালে তাঁর জন্ম নেপালে। ১২ বছর বয়সেই তাঁর বাবা, মা মারা যান। তখন কাকার হাত ধরে চলে আসেন মালবাজার ব্লকের রাঙ্গামাটি চা বাগানে। কিশোর বয়সে তিনি দেখেছেন ভারতের স্বাধীনতাপ্রাপ্তি। স্বাধীনতাযুদ্ধে তিনি অংশগ্রহণ না করলেও ভারতের হয়ে তিনবার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর মূলত কাজ ছিল সেনাবাহিনীর কাছে সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া। এই কাজ করতে গিয়ে কয়েকবার মুখ থেকে ফিরে এসেছেন। কিন্তু তাঁকে কেউ মনে রাখেনি। আজ তিনি অসহায় সম্বলহীন। পদম বলেন, রাঙ্গামাটি চা বাগানের সাহেবের কাছ থেকেই আমি গাড়ি চালানো শিখেছিলাম। অভাবের কারণে পড়াশোনাও বেশিদূর এগোয়নি। বাগানের জিপ তিনি চালাতেন। ১৯৬২ সালে ভারত-চিন যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীর আবদারে বাগানের জিপ নিয়ে বেরিযে পড়েন তাঁদের সঙ্গে। কয়েকজন মিলিটারি জওয়ানকে নিয়ে চলে যান অরুণাচল প্রদেশের জিরো পয়েন্টে। সেখানে জঙ্গলের মধ্যে থাকার সময় চিনা সৈন্যদের আক্রমণের মুখে পড়েন। কয়েকজন মিলিটারির সঙ্গে কোনোরকমে প্রাণ হাতে করে পালিযে বাঁচেন। যুদ্ধ শেষে ফিরে আসেন আবার সেই রাঙ্গামাটি চা বাগানে। তখন কোচবিহারে পাকা রাস্তা নির্মাণের পাথর বহনের ট্রাক চালাতেন। তারপর আবার তাঁর ডাক পড়ে ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়। তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া হয় বাগডোগরা বিমানবন্দর থেকে বিভিন্ন সামগ্রী সীমান্তে কর্তব্যরত জওয়ানদের কাছে পৌঁছে দেওয়া। এই কাজ করতে গিয়ে তিনি পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ থেকে কোনোরকমে বেঁচে ফিরেছেন। অনেক জওয়ান তাঁর কাছ থেকে গাড়ি চালানো শিখেছেন বলে পদম জানান। তিনি বলেন, আমার আবার ডাক পড়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে। তখন আমার কাজ ছিল বাগডোগরা থেকে ট্রাকে করে জওয়ানদের বাংলাদেশ পৌঁছে দেওয়া এবং সেখান থেকে আহত সৈনিকদের হাসপাতালে নিয়ে য়াওয়া। সেবারও পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণের মুখে পড়েছিলাম। এভাবেই কেটেছে আমার জীবনের অনেকটা সময়। টুরিস্ট বাস নিযে ভারতের প্রায় সর্বত্র ঘুরেছেন। এখন আর গাড়ি চালান না। তবে এখনও তাঁকে এলাকার মানুষ ড্রাইভার চাচা বলে চেনেন।