প্রকৃতির কাছে শিক্ষা নিয়ে পদ্মশ্রী আলি আবিষ্কার করেছেন মাছের প্রজাতি

535

পুলকেশ ঘোষ, কলকাতা : তাঁর কোনও প্রথাগত শিক্ষাই নেই। কারণ, তিনি মনে করেন, প্রকৃতিই আসল শিক্ষক। বাদবাকি সবই কৃত্রিম। সেখান থেকে শেখার কিচ্ছু নেই। এটা শুধু তাঁর ভাবনা নয়, ৮২ ছুঁইছুঁই বয়সে তা প্রমাণ করে দেখিয়ে দিয়েছেন এম আলি মানিকফান।

১৪টি ভাষায় তাঁর দখল। আবিষ্কার করেছেন সামুদ্রিক প্রাণীর বহু প্রজাতি। মাছের একটি প্রজাতির নামকরণ হয়েছে তাঁর নামেই। তিনি তৈরি করেছেন বিশাল কাঠের জাহাজ। সেই জাহাজে এক অভিযাত্রী ওমান থেকে চিন পর্যন্ত ৯৬০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়েছেন। তিনি মুসলিমদের জন্য তৈরি করেছেন চান্দ্র ক্যালেন্ডার। তাঁর আবিষ্কারের তালিকা থেকে বাদ যায়নি মোটর সাইকেলও। চাকরি করেছেন শিক্ষকতার। স্বেচ্ছা অবসর নিয়েছেন কেন্দ্রীয় সরকারের রামেশ্বরমের সেন্ট্রাল মেরিন রিসর্ট ইনস্টিটিউট থেকে। এহেন বিস্ময়মানবকে এই বছর পদ্মশ্রীতে ভষিত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার।

- Advertisement -

কলকাতায় পার্ক সার্কাস ময়দানের এখন সংখ্যালঘু উন্নয়ন ও বিত্ত নিগমের চেয়ারম্যান পিবি সেলিম পরিচয় করিয়ে দিলেন মানিকফানের সঙ্গে। ময়দানে চলছে রাজ্য সরকারি মেলা। সেখানেই সম্মানিত করা হল তাঁকে। সেই ফাঁকেই কথা হচ্ছিল সেই বিস্ময় ব্যক্তির সঙ্গে। সাধারণ চেহারা, ধপধপে সাদা চুল-দাড়ি। কথা বলেন নীচু গলায়। কে বলবে তাঁর মধ্যে এত বিস্ময় লুকিয়ে আছে! ১৯৩৮ সালের ১৬ মার্চ তাঁর জন্ম লাক্ষাদ্বীপ দ্বীপপুঞ্জের মিনিকয় দ্বীপে। বাবার নাম মুসা মানিকফান। মায়ের নাম ফতিমা মানিকা।

মিনিকয় দ্বীপে তখন স্কুলই ছিল না। পড়ব কোথায়? মুচকি হেসে বলেন আলি। একটু অন্যমনস্ক হয়ে বলতে থাকেন, অনেক পরে ব্রিটিশরা একটা স্কুল করেছিল। তারপর স্বাধীন ভারতে স্কুল হয় ১৯৫০ সালে। বাবা আমাকে কন্নৌড়ে পাঠিয়েছিলেন স্কুলে পড়ার জন্য। কিন্তু আমার পোষায়নি। কদিনেই বুঝলাম, ওই বই-খাতার মেকি পড়াশোনা আমার জন্য নয়। আমার আগ্রহ অত্যন্ত প্রখর। আমি প্রকৃতির কাছ থেকেই সব শিখেছি। নানা দেশের মানুষের কাছ থেকে শিখেছি সেখানকার ভাষা। তাঁর মাতভাষা দিবেহী বা মাহি। কিন্তু এর বাইরেও ইংরেজি, হিন্দি, মালয়ালম, আরবি, ল্যাটিন, ফরাসি, রাশিয়ান, জার্মান, সিংহলি, পার্সিয়ান, সংস্কৃত, তামিল ও উর্দু গড়গড় করে বলতে পারেন তিনি। সামুদ্রিক প্রাণীবিজ্ঞান, সামুদ্রিক গবেষণা, ভূগোল, জ্যোতির্বিদ্যা, সমাজবিজ্ঞান, প্রথাগত পদ্ধতিতে জাহাজ নির্মাণ, শিক্ষা, মৎস্যচাষ, কৃষি ও ফুলচাষ সবেতেই রীতিমতো পারদর্শী তিনি। ১৯৫৬ সালে তিনি শিক্ষকতার চাকরি করেছেন। আবার পরে তা ছেড়ে মিনিকয় দ্বীপে কেন্দ্রীয় সরকারের করণিক পদে কাজ করেছেন। তখন ওই পদটি ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে দ্বীপের প্রধান পদ। তাঁকে সবসময় টানত সমুদ্র। তাই ১৯৬০ সালে তিনি কেন্দ্রীয় সামুদ্রিক মৎস্য গবেষণা সংস্থায় যোগ দেন।

মানিকফান বহু সামুদ্রিক প্রাণী প্রজাতি আবিষ্কার করেছেন। বিখ্যাত সামুদ্রিক প্রাণী গবেষক সান্তাপ্পান জোন্সের সঙ্গে কাজ করার সময় মাছের একটি নতুন প্রজাতি আবিষ্কার করেন। তাঁর নামেই ওই প্রজাতির মাছের নামকরণ করা হয় আবু ডেফডুফ মানিকফানি। পরবর্তীকালে সান্তাপ্পান মাছের বিভিন্ন প্রজাতি নিয়ে যে গবেষণালব্ধ বই লিখেছেন, তার সহগবেষক হিসেবে তিনি নাম রেখেছেন মানিকফানের। প্রকৃতি মানিকফানকে শিখিয়েছে কৃষির অন্যরকম পদ্ধতি। তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলি জেলার ভালিউরে তাঁর ১৫ একর জমিতে তিনি যে চাষ করেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ তৈরি করেন নিজস্ব হাওয়া কল থেকে। তাঁর সেখানকার বাড়ি তৈরি হয়েছে প্রকৃতি থেকে পাওয়া একেবারেই পরিবেশবান্ধব প্রাকৃতিক জিনিস দিয়ে মাঝে ১৯৫৬ সালে কিছুদিন কলকাতাতেও থেকেছেন মানিকফান। তাঁর স্বীকারোক্তি, কলকাতা আমার খারাপ লাগেনি। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমার দ্বীপের জন্য মনটা হাঁপিয়ে উঠেছিল। মাস ছয়েকের বেশি থাকতে পারিনি এখানে। ফিরে যাই মিনিকয়ে।

জানতে চাইলাম, তাঁর তৈরি জাহাজের কথা। বললেন, ১৯৮১ সালের কথা। টিম সাভরিন বলে একজন আইরিশ অভিযাত্রী আমাকে একটি প্রাচীন আরব জাহাজ নতুন করে তৈরির বরাত দেন। আমি ওমানে কাঠপত্র নিয়ে পৌঁছে যাই। কোনও ধাতু ছাড়া শুধুমাত্র নৌকো তৈরির সামগ্রী দিয়ে হাতে করে আমি ২৭ মিটার লম্বা জাহাজটি তৈরি করি। টিম ওই জাহাজে আটমাস দীর্ঘ সমুদ্রয়াত্রা করে ওমান থেকে চিন পৌঁছোয়। শোহর নামের ওই জাহাজটি এখন ওমানের জাদুঘরে আছে। আলি যে মোটর সাইকেলটি তৈরি করেছেন, তাতে প্রথমে প্যাডেল করতে হয়। তারপর মোটর স্টার্ট নেয়। সেই বাইকে নিজের ছেলে মুসাকে বসিয়ে তিনি তামিলনাড়ু থেকে দিল্লি গিয়েছেন। প্রতিদিন ৬০-৭০ কিলোমিটার করে পথ পাড়ি দিতেন। বাইকের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩৫ কিলোমিটার হলেও পেট্রোল বাইকের চেয়ে তার জ্বালানি লাগে অনেক কম বলে তিনি জানিয়েছেন। পায়ে নীচে যেন সর্ষে আলির। এক জায়গায় বেশিদিন থাকতে পারেন না। কখনও সময় কাটান জাহাজের লাইট হাউসে, আবার কখনও বা আবহাওয়া দপ্তরের পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে। তাঁর দিকে তাকিয়ে একটা সত্য উপলব্ধি হল। প্রকৃতির কোলে এই ধরনের প্রেমিকরা আছেন বলেই আজও পৃথিবী এত সুন্দর।