এরিকের তুলিতে বিশ্বের দরবারে ডুয়ার্স

453

শুভজিত্ দত্ত  নাগরাকাটা : ছেলেটি পাহাড় আঁকে। রং-তুলিকেই হাতিয়ার করে সে স্বপ্ন দেখে নিজের প্রিয় ডুয়ার্সকে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দেওয়ার। এই বয়সে সে সেটাও করে দেখাতে শুরু করেছে। নাগরাকাটার ভগত্পুর চা বাগানের শ্রমিক পরিবারের বছর কুড়ির যুবক এরিক স্যামুয়েল কুজুরের আঁকা ছবি এখন উচ্চ প্রশংসিত হচ্ছে ডেনমার্ক, নরওয়ের মতো দেশের প্রদর্শনীতেও। এরিক বলেছে, পড়াশোনার পাঠ শেষ করে ডুয়ার্সের ছেলেমেয়েছের জন্য এখানেই ফাইন আর্টের ওপর একটি অ্যাকাডেমি গড়তে চাই। চা বাগানে প্রতিভার অভাব নেই। শুধু দরকার একটু সুযোগ।

ভগত্পুর চা বাগানের চাদর লাইন নামে একটি শ্রমিক মহল্লায় এরিকদের বাড়ি। বাবা সুনীল কুজুর ওই বাগানেরই নৈশপ্রহরী। মা পরামুনি কুজুর গৃহবধূ। তিন ভাইবোনের মধ্যে সে-ই বড়ো। খুব ছোটোবেলা থেকেই এরিকের ছবি আঁকার প্রতি আগ্রহ। এজন্য অবশ্য কোনো প্রথাগত শিক্ষা সে পায়নি। নিজে থেকেই ওই কাজ চালিয়ে যেতে থাকে। স্কুলে পড়াকালীন তাদের বাড়ির পাশেই নরওয়ে থেকে আসা লিসবেথ বিজার্ক নামে এক মহিলার এরিকের আঁকা একটি ছবি মনে ধরে। পাঁচশো টাকা দিয়ে তিনি তা একপ্রকার জোর করে কিনেও নেন। সঙ্গে উত্সাহ দিয়ে যান ছবি আঁকাতেই লেগে থাকতে। ইতিমধ্যে উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরোনোর পর  মনে গেঁথে থাকা লিসবেথ-এর পরামর্শ মেনে আঁকিবুঁকিকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয় সে। স্নাতকস্তরে আর্ট নিয়ে পড়াশোনার জন্য ভরতি হয় রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে। বর্তমানে তাঁর অ্যাপ্লায়েড আর্ট-এর ওপর তৃতীয়বর্ষ চলছে। ইচ্ছে ভবিষ্যতে আর্টের ওপর অধ্যাপনা করার।

- Advertisement -

বিদেশে কীভাবে পাড়ি দিচ্ছে তাঁর আঁকা ছবি? এক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছেন সেই নরওয়ের মহিলা লিসবেথ। তিনিই এরিকের ছবিগুলি এদেশ থেকে নিয়ে গিয়ে ইউরোপের দেশগুলিতে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। সম্প্রতি তাঁর আঁকা তেল রং-এর ৫টি ছবি সেখানে ব্যাপক সাড়া ফেলে। প্রকৃতিনির্ভর ছবিগুলিতে আলো আঁধারির মিশেল আর রং-এর সুনিপুণ ব্যবহার সাগরপাড়ের শিল্পীদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এর আগে লিসবেথেরই হাত ধরে ডুয়ার্সে নানা ধর্মীয় কারণে আসা অন্য দেশের বাসিন্দারাও তাঁর ছবি কিনে নিয়ে গিয়েছেন। তেল রং-এর ছবিতে আগ্রহ বেশি থাকলেও জল রং, স্কালপচার, মিক্সড মিডিয়া য়ে কোনো মাধ্যমেই ছবি আঁকতে তার  কোনো না নেই। বর্তমানে পাঠক্রমের অঙ্গ হিসেবে সে ঝুঁকেছে ডিজিটাল ছবিতেও। এমন ছেলেও যে ডুয়ার্সে লুকিয়ে রয়েছে তা জানাই ছিল না উত্তরবঙ্গের চা বাগানকে নিজের হাতের তালুর মতো করে চেনা বাগান বিশেষজ্ঞ রামঅবতার শর্মার। তিনি বলেন, ওর হাত ধরে এখানকার এমন অন্য প্রতিভারাও যদি বিকশিত হতে পারে তার থেকে ভালো আর কিই বা হতে পারে। নাগরাকাটার বিডিও স্মৃতা সুব্বা বলেন, দ্রুত ছেলেটিকে সংবর্ধনা দেওয়া হবে। আর্ট নিয়ে এখানে কেউ পড়াশোনা করে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার স্বপ্ন দেখছে এমনটা আগে চোখে পড়েনি।