ঘরবন্দি শহরবাসীর মনের রসদ জোগাচ্ছেন বীরভূমের পরিমল

294

শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : লকডাউনের জেরে মন ভালো নেই শহরবাসীর। বন্ধ ঘরে থেকেই কেউ যেমন পুরোনো সময়ে স্মৃতি ঘাটছেন, কেউ অপেক্ষায় রয়েছে খাঁচাবন্দি জীবন ছেড়ে বাইরে বেরোনোর। তবে এসব কিছুর মধ্যেই কোথাও যেন ভেসে আসছে বাউল গানের সুর, কখনও শ্যামাসংগীতের। ঘরবন্দি একঘেয়েমি জীবনের মাঝেই হঠাৎ করে রাস্তা থেকে মন কেমন করা এই গান কানে আসতেই কেউ যেমন জানলা দিয়ে উঁকি দিচ্ছেন, কারও মুখে হাসি ফুটছে। শহরের রাস্তায় ঘুরে ঘুরে এই মন ভালো করার মাধ্যমই হয়ে উঠেছেন পরিমল ঘোষ। লকডাউনের জেরে ট্রেন বন্ধ থাকায় আপাতত নিজে বাড়িতে না ফিরতে পারলেও গানের বইয়ে ভরা ব্যাগটা ও হাতের দোতারাকে সঙ্গী করে অজান্তেই শহরবাসীর মন কেমন করছেন সাদা পোশাকের এই ব্যক্তি।

- Advertisement -

পরিমল ঘোষের বাড়ি বীরভূমের কীর্ণাহারের মাস্টারপাড়ায়। বর্তমানে পরিবারে রয়েছেন মা, বৌদি ও মানসিক ভারসাম্যহীন এক ভাই। ছোটবেলা থেকেই পরিমলবাবুর সংগীতের প্রতি বিশেষ টান ছিল। তবে কম বয়সেই পেটে টান পড়ায় পরিবার টানার কাজ শুরু করেন এই ব্যক্তি। পরিমলবাবুর কথা সূত্রে জানা যায়, কখনও চাষের মাঠ, কখনও কলকাতায় গিয়ে ব্যবসা করে সংসারের খরচ জোগানোর লড়াইটা তিনি চালিয়ে গিয়েছেন। তবে ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি অগাধ প্রেম তাঁকে বারবার টানত। তাঁর কথায়, সেই টানই বছর দুয়ে আগে তাঁকে সংগীতের উপাসকে পরিণত করে। আর বীরভূম মানেই য়ে বাউল গান। কাঁধে ওঠে গানের বইয়ে ভরা ব্যাগ। হাতে দোতারা। সিদ্ধান্ত নেন, ঘুরে ঘুরে গানের মাধ্যমেই তিনি বাড়িতে মায়ের হাতে কিছু টাকা তুলে দেবেন। এরপরই শুরু হয় সংসার চালানোর নতুন যাত্রা। কখনও ট্রেনে করে উত্তরবঙ্গ, কখনও রাজ্যের অন্যত্র তিনি চলে যান। তবে শিলিগুড়ি-পাহাড়ই যে তাঁর সবচেয়ে পছন্দের সেটাই বলছিলেন বছর চুয়ান্নর এই ব্যক্তি। তিনি বলেন, বছরে দুবার আমি শিলিগুড়ি আসি। শিলিগুড়ি থেকে কখনও পাহাড়ে চলে যাই। এখানকার মানুষ আমার খুব ভালো লাগে। গান করে ভিক্ষা চাইতেই অনেকে খুশি হয়ে টাকা দেন। তবে লকডাউনের জেরে এবারে পরিবারের থেকে দূরে থাকাটা যে বড্ড বেশি হয়ে গেল, সে কথাই বলছিলেন পরিমলবাবু। তিনি বলেন, সারাদিনে গান গেয়ে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া কিছু টাকা নিয়ে কখনও গাছতলা, কখনও মন্দির, মসজিদে কাটিয়ে দিই। কিছুদিন থাকার পর বাড়িতে ফিরে পরিবারের হাতে টাকা তুলে দিই। আমার অসুস্থ মা যে আমার অপেক্ষা করেন। তবে এবারের অপেক্ষাটা একটু বেশি হল। তিনি বলেন, বাউল গান প্রধান হলেও অন্য গান গাইতেও আমার সমস্যা নেই। মনে অনেক চিন্তা নিয়ে বাড়িতে ফেরার পথেই হঠাৎ চম্পাসারি মোড় এলাকায় দোতারার আওয়াজটা শুনে থমকে গিয়েছিলেন শহরের বাসিন্দা অজয় সরকার। তিনি বলেন, লকডাউনের মাঝে হঠাৎ করে আচমকা বাউল গান মনটাকে যেন নতুন করে বাঁচার রসদ দিল।