কোচবিহার দক্ষিণ আসনে পার্থ-মিহির লড়াই হতে পারে

166

গৌরহরি দাস, কোচবিহার : দুপক্ষের কাছেই কোচবিহারে মর্যাদার লড়াই। মিহির গোস্বামীকে ভাঙিয়ে বিজেপি যে ধাক্কা দিয়েছে তা সুদে-আসলে ফিরিয়ে দিতে মরিয়া তৃণমূল কংগ্রেস। অন্যদিকে, জেলা থেকে তৃণমূলকে উপড়ে ফেলার এটাই সবচেয়ে ভালো সুযোগ বলে মনে করছেন গেরুয়া শিবিরের নেতারা। দেরি না করে তাই দুপক্ষই প্রার্থীদের নাম প্রাথমিকভাবে ঠিক করে ফেলেছে। সেই তালিকা মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, সব হিসাব কার্যকর হলে কোচবিহার দক্ষিণ আসনে মুখোমুখি লড়াই হতে পারে দলছুট বিধায়ক মিহির গোস্বামীর সঙ্গে তৃণমূলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়ের।
কোচবিহার জেলায় মোট নয়টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে। ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি একটি আসনেও জিততে পারেনি। সেই জায়গা থেকে গত লোকসভা নির্বাচনে কোচবিহার লোকসভা কেন্দ্রে বিজেপি জেতার পর থেকেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। লোকসভা নির্বাচনে ভালো ফলাফলের পর থেকেই কোচবিহারে বিজেপি ক্রমশ তাদের শক্তি বাড়িয়ে চলেছে। অপরদিকে, গোষ্ঠীকোন্দলের কারণে জেলায় তৃণমূল অনেকটা শক্তিক্ষয় করে ফেলেছে। এই পরিস্থিতিতে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে কোচবিহারকে পাখির চোখ করেছে বিজেপি। অপরদিকে, নিজেদের কোন্দল থাকলেও নির্বাচনে বিজেপিকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ তৃণমূল কংগ্রেস। বিজেপিকে হারাতে তারাও আদাজল খেয়ে মাঠে নেমে পড়েছে। রাজনৈতিক এই প্রেক্ষাপটে কোচবিহারে বিধানসভা নির্বাচন যে বিজেপি ও তৃণমূল দুপক্ষের কাছেই শক্ত লড়াই হতে চলেছে, তা স্বীকার করে নিয়েছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও।
কোচবিহারে নির্বাচনি ফলাফল কী হতে পারে, কোন আসনে কারা জয় পেতে পারে, তা নিয়ে তৃণমূলের আইপ্যাক সংস্থা এবং বিজেপির নমো ইন্ডিয়া নামে একটি সংস্থা প্রকাশ্যেই কাজ করছে। এছাড়াও মুম্বইয়ের একটি সংস্থা এবং দুই-একটি সর্বভারতীয় সংস্থাও অত্যন্ত গোপনে তাদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সূত্রের খবর, এখন পর্যন্ত কোনও সংস্থা নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেনি কোচবিহারে তৃণমূল-বিজেপি কে কয়টি আসনে জয়লাভ করবে। তবে দুদলের সমীক্ষাতেই একটা কথা পরিষ্কার- এবার প্রার্থী বাছাইয়ের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। ফলে কোন দলের কে প্রার্থী হচ্ছেন তা নিয়ে মানুষের জল্পনার শেষ নেই।
দুদলের জেলা নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, তৃণমূল মাথাভাঙ্গা বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিধায়ক বিনয়কৃষ্ণ বর্মনকে সরিয়ে সম্ভবত কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে প্রার্থী করতে চলেছে। এই আসনে আবার দলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়ের অনুগামী তথা দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক রাহুল রায়ের নামও ঘোরাফেরা করছে। মাথাভাঙ্গা কেন্দ্রে কোচবিহার পঞ্চানন বর্মা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসার সাবলু বর্মন ও তৃণমূলের প্রবীণ নেতা গিরীন্দ্রনাথ বর্মনের নাম শোনা যাচ্ছে। এছাড়া এসজেডিএর চেয়ারম্যান বিজয়চন্দ্র বর্মনকে এখানে দলের একাংশ চাইছেন। কোচবিহার জেলায় সবচেয়ে নজরকাড়া আসন হয়ে উঠেছে কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্র। দলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায় এখানে অথবা শীতলকুচি আসন থেকে দাঁড়াতে পারেন। কোচবিহার দক্ষিণে পার্থ ছাড়াও বিকল্প হিসাবে সুচিস্মিতা দেবশর্মার নামও শোনা যাচ্ছে। শীতলকুচিতে অবশ্য দলের বর্তমান বিধায়ক হিতেন বর্মনের প্রার্থী হওয়ারও যথেষ্ট সম্ভবনা রয়েছে। দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তুফানগঞ্জে সম্ভবত কোনও সেলেব্রিটিকে দাঁড় করানো হতে পারে। সেক্ষেত্রে কোচবিহারের বাসিন্দা তথা বলিউড নায়িকা মৌনি রায় ও রাইমা সেন ছাড়াও ইন্দ্রাণী হালদার, খেলোয়াড় শিবশংকর পালের মতো একাধিক নাম ভেসে উঠেছে। এছাড়াও কেন্দ্রটিতে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল আহমেদের নাম শোনা যাচ্ছে।
নাটাবাড়িতে সম্ভবত মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষই আবার দাঁড়াচ্ছেন। সিতাইয়ের বিধায়ক জদগীশ বর্মাবসুনিয়ার দাঁড়ানোর সম্ভাবনাই বেশি। দিনহাটায় বিধায়ক উদয়ন গুহর পাশাপাশি গ্রেটার নেতা বংশীবদন বর্মনের নাম উঠে এসেছে। মেখলিগঞ্জে অর্ঘ্য রায়প্রধানের পাশাপাশি তৃণমূল নেতা পরেশচন্দ্র অধিকারীর নামও শোনা যাচ্ছে। বিজেপির প্রাথমিক তালিকা অনুযায়ী, কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা আসনে পার্থর বিরুদ্ধে বিধায়ক মিহির গোস্বামীকেই দাঁড় করাতে যাচ্ছে বিজেপি। কেন্দ্রটিতে দলের জেলা সম্পাদক তথা বিশিষ্ট আইনজীবী রাজু রায়ের নামও শোনা যাচ্ছে। দলের জেলা সভাপতি মালতী রাভার দাঁড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে তুফানগঞ্জ কেন্দ্রটিতে। তুফানগঞ্জে মালতী রাভার বাড়ি বলেও এই আসনে তাঁর দাঁড়ানোর সম্ভাবনা প্রবল। মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষের মুখোমুখি নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে দাঁড়াতে পারেন বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চক্রবর্তী। কোচবিহার উত্তর কেন্দ্রে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক সুকুমার রায়ের নাম শোনা যাচ্ছে। দিনহাটা বিধানসভা কেন্দ্রে বিজেপি নেতা দীপ্তিমান সেনগুপ্ত, সুদেব কর্মকার ও এলাকার প্রাক্তন বিধায়ক অশোক মণ্ডলের নাম শোনা যাচ্ছে। তবে দীপ্তিমান সেনগুপ্ত প্রার্থী হলে কড়া মোকাবিলা হবে, সেকথা মানছেন তৃণমূল নেতাদের একাংশও।
সিতাই কেন্দ্রে বিজেপির জেলা সহ সভাপতি ভবেন রায় ও দীপক রায়ের নাম শোনা যাচ্ছে। মাথাভাঙ্গা কেন্দ্রে দলের জেলা সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ বর্মন ও শীতলকুচিতে দলের প্রাক্তন জেলা সভাপতি হেমচন্দ্র বর্মন বা বরেন বর্মন প্রার্থী হতে পারেন। মেখলিগঞ্জে দধিরাম রায়ের প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা। বিজেপির জেলা সভাপতি মালতী রাভা বলেন, প্রার্থী হতে চেয়ে আমাদের কাছে ৬৫টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে দলের বিভিন্ন নেতা-নেত্রীও রয়েছেন। আগামীকাল সেই নামগুলি ই-মেল করে রাজ্য সভাপতিকে পাঠাব। তবে, এটা সম্পূর্ণ দলের রাজ্য ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঠিক করবেন। এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই। তৃণমূলের জেলা সভাপতি পার্থপ্রতিম রায়ও বলেন, প্রার্থী নিয়ে আমাদের আলোচনার কোনও জায়গা নেই। এটা সম্পূর্ণ আমাদের দলনেত্রী ঠিক করবেন।