দালালকে উত্তম-মধ্যম দিলেন রোগীর পরিজনেরা, উত্তেজনা রায়গঞ্জ মেডিকেলে

রায়গঞ্জ: টাকা নিয়ে ভ্যাকসিন দেওয়ার অভিযোগ উঠল স্বাস্থ্য দপ্তরের অস্থায়ী কর্মীর বিরুদ্ধে। অভিযোগ, নবজাতক শিশুদের টিকা দেওয়ার জন্য কারও কাছ থেকে ৩০০ টাকা, কারও কাছ থেকে ৭০০ টাকা নিয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেলে প্রতারণা চলছে।

বুধবার হাসপাতালে চিকিৎসারত নাসিমা খাতুনের সদ্যোজাত কন্যা সন্তানের জন্য ২০০ টাকা ভ্যাকসিন দেওয়ার জন্য নিয়ে ওই যুবক সেখান থেকে উধাও হয়ে যায়। বাড়ির লোকেরা খোঁজাখুঁজি করেও অভিযুক্ত যুবককে খুঁজে পায়নি। বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই যুবককে দেখেই চিৎকার শুরু করে দেয় পরিবারের লোকেরা। ক্ষুব্ধ অন্যান্য রোগীর পরিবার-পরিজনরা অভিযুক্ত কর্মবন্ধুকে বেধড়ক ধোলাই দেন।

- Advertisement -

রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের সিসিইউ বিভাগ ক্যাম্পাসে এই ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে উত্তেজিত রোগীর পরিবার-পরিজনদের সামাল দিতে পৌঁছায় পুলিশ। এরপর অভিযুক্ত দালালকে আটক করে রায়গঞ্জ থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, অভিযুক্ত ওই যুবকের নাম মনি সাহা। তাঁর বাড়ি রায়গঞ্জ থানার রূপাহার গ্রামে।

রোগীর পরিবার সূত্রে জানা যায়, চলতি মাসের ২৮ তারিখে নাসিমা খাতুন কন্যা সন্তান প্রসব করেন। গতকাল ফোন মারফত পরিজনদের জানানো হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সদ্যোজাত কন্যা সন্তানকে টিকা না দিলে মৃত্যু হতে পারে। সেই ইনজেকশনের দাম ১২০০ টাকা। গতকাল রাতে ওই যুবককে ২০০ টাকা দেওয়ার পর হরিরামপুরের বাড়িতে টাকা আনতে চলে যান গোলাম সাব্বির। এদিন সকালে টাকা নিয়ে আসেন তিনি।

যুবককে টাকার জন্য ফোন করা হয়। বারংবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন তোলেননি। এরপর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে গোলাম জানতে পারেন, ইনজেকশন বা টিকার জন্য কোন পয়সা লাগে না। তখনই তিনি বুঝে যান দালালের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ওই যুবকের খোঁজ শুরু হয়।  খুঁজতে খুঁজতে শিশু বিভাগের সামনে দেখা মেলে তাঁর।

সাব্বির ও তার পরিবারের চিৎকার-চেঁচামেচিতে ছুটে আসে অন্যান্য রোগীর পরিবারের লোকেরা। এরপর শুরু হয় গণধোলাই। দালালকে ধরে উত্তম-মধ্যম মারতে শুরু করেন অনেকে। খবর যায় রায়গঞ্জ থানায়। পুলিশ এসে অভিযুক্তকে আটক করে নিয়ে যায়। তবে শুধু একজনের কাছ থেকে নয় গত কয়েক মাস ধরে একাধিক রোগীর পরিবার পরিজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে চলেছেন অভিযুক্ত যুবক। এছাড়া চাকরি দেওয়ার নাম করে রূপাহার এলাকায় চালু হওয়া একটি অফিসে সেখানেও অভিযুক্ত যুবকের শেয়ারও রয়েছে।

মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ দিলীপকুমার পাল বলেন, দীর্ঘ দুই বছর যাবৎ রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসে দালাল রাজের ঘটনা শুনেছি। দালালরা মেডিকেল কলেজে এসে প্রসূতি মায়েদের নার্সিংহোমে নিয়ে যায়। আবার অবস্থা খারাপ হলে হাসপাতালে ভর্তি করে। দালালদের ধরার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে সিআইডি তদন্ত চলছে। এই দালালদের সঙ্গে আমাদের কোন কর্মী জড়িত থাকে তাঁকেও ডিপার্টমেন্টাল শাস্তি পেতে হবে। হাসপাতালে দালালদের বরদাস্ত করা হবে না। কেউ দালালি করতে আসলে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়া হবে।

অভিযুক্ত যুবক মনি সাহা বলেন, আমি রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজের কর্মবন্ধু পদে রয়েছি। আমি ওই পরিবারের কাছ থেকে মিষ্টি খাওয়ার জন্য ২০০ টাকা নিয়েছিলাম। প্রত্যেকের কাছ থেকেই মিষ্টি খাওয়ার জন্য টাকা নেই। যদিও হাসপাতাল ক্যাম্পাসে এক প্রসূতি রোগীর স্বামী নজরুল হক বলেন, দিন তিনেক আগে আমার স্ত্রীকে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজে প্রসব বেদনা নিয়ে ভর্তি করেছি। এদেরই একটা চক্র আমাকে বারংবার বলে মেডিকেল কলেজে ভালো চিকিৎসা হয় না, একথা জানিয়ে নার্সিংহোমে ভর্তির কথা বলে।

রায়গঞ্জ থানার পুলিশ আধিকারিক বলেন, এক যুবককে আটক করা হয়েছে। যুবকের কাছ থেকে পাওয়া টাকা বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। তদন্ত চলছে। উল্লেখ্য, করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে দালালচক্র সক্রিয় হয়ে উঠেছে। করোনার ভয় দেখিয়ে মেডিকেলে চিকিৎসা করাতে আসা রোগীদের বিভিন্ন নার্সিংহোমে ভর্তি করতে প্রভাবিত করছে ওই দালালচক্রের সদস্যরা। ফাঁদে পা দিয়ে বেশকিছু রোগী মোটা টাকার বিনিময়ে ভর্তিও হচ্ছেন।

বিষয়টি জেনে মেডিকেলে আসা রোগীদের মন থেকে আশঙ্কা দূর করতে তাঁদের আশ্বস্ত করছে কর্তৃপক্ষ। রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নোডাল অফিসার বিপ্লব হালদার বলেন, আমাদের হাসপাতালে অত্যন্ত উন্নতমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। এখানে কোনও করোনা রোগী ভর্তি থাকেন না। সুতরাং চিকিৎসা নিতে আসা রোগীরা বা তাদের আত্মীয়রা নিশ্চিন্তে আমাদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ বা চিকিৎসা নিতে পারেন। অচেনা কারও কথায় অযথা আতঙ্কিত হয়ে অন্যত্র যাওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই।

রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হাজার খানেক বেড রয়েছে। তবে সাধারণ সময় বেড সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকেন। তবে করোনা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দালালচক্র সক্রিয় হয়ে ওঠায় রোগীর সংখ্যা বেশ খানিকটা কমে গিয়েছে। বিষয়টি নজরে এসেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরও। রায়গঞ্জ মেডিকেলের এক চিকিৎসক বলেন, আমাদের এখানে বর্তমানে কমবেশি ১০০০ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। একটি চক্র সাধারণ মানুষদের অনেককেই ভুল বুঝিয়ে অন্যত্র পাঠানোর চেষ্টা করছে বলে আমাদের কানেও এসেছে। এই বিষয়টি নিয়ে কী কী পদক্ষেপ করা যায় তা নিয়ে আমরা ভাবনাচিন্তা শুরু করেছি। প্রয়োজনে পোস্টারও দেওয়া হতে পারে।

রায়গঞ্জ মেডিকেলে আটটি ওয়ার্ড রয়েছে। মেডিসিন বিভাগ, সার্জিক্যাল বিভাগ, বার্ন ইউনিট, গাইনি বিভাগ, শিশু বিভাগ, অস্থি বিভাগের মতো দৈনন্দিন চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিভাগই রায়গঞ্জ মেডিকেলে রয়েছে। সিক নিওনেটাল কেয়ার ইউনিট, ক্রিটিকাল কেয়ার ইউনিট, ডায়ালিসিস ইউনিট, নাক-কান-গলা ও অন্যান্য অঙ্গের অত্যাধুনিক চিকিৎসা রায়গঞ্জ মেডিকেলে করিয়ে অনেকেই সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন বলে দাবি কর্তৃপক্ষের।

রায়গঞ্জের বাসিন্দা অজয় দাস বলেন, আমার সন্তানসম্ভবা স্ত্রী’র ভর্তির সম্পর্কে জানতে সম্প্রতি রায়গঞ্জ মেডিকেলে গিয়েছিলাম। কিন্তু হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মী পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি আমাকে বলেন, মেডিকেলে সন্তান প্রসবের জন্য ভর্তি করলে মা ও সদ্যোজাত দু’জনেরই করোনায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি নার্সিংহোমের ঠিকানা ওই ব্যক্তির কাছ থেকে নিয়ে ৩০ হাজার টাকার প্যাকেজে স্ত্রীকে সেখানে ভর্তির ব্যবস্থা করে এসেছি।

রায়গঞ্জের বাসিন্দা সুনীল মন্ডলও এক নার্সিংহোমে তার বোনের চিকিৎসা করিয়েছেন মোটা টাকার বিনিময়ে। তাঁর বক্তব্য, মেডিকেলে গেলে করোনা সংক্রমণের ভয় রয়েছে বলে হাসপাতাল চত্বরে আমাকে জানিয়েছিলেন এক ব্যক্তি। তাই ভয়ে বোনকে অন্যত্র নিয়ে গিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। গাইনি বিভাগের এক চিকিৎসক, নিরাপত্তারক্ষী ও তিনজন নার্স করোনা আক্রান্ত হয়েছেন বলে আমাদের ভয় দেখানো হচ্ছে।