গামছা পরে কাদা পেরিয়ে গায়ে ওঠে পোশাক

সাজাহান আলি, পতিরাম : সামান্য বৃষ্টি হলেই এখন আঁতকে ওঠেন গ্রামবাসীরা। যে বৃষ্টির জন্য হাপিত্যেশ করে বসে থাকেন অসংখ্য মানুষ, সেই বৃষ্টিই দুর্বিষহ করে তোলে এই গ্রামের মানুষগুলির জীবন।

গ্রামবাসীদের অভিযোগ, রাস্তা এতই খারাপ যে, বর্ষাকালে কখনও এক হাঁটু আবার কখনও গোড়ালি পর্যন্ত কাদা জমে যায়। আর সেই কাদামাখা রাস্তা পেরিয়ে কোনওরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে চলাফেরা করতে হয়। ভালো জামাকাপড় পরে ওই রাস্তা দিয়ে চলাফেরার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। বেশিরভাগ সময়ই লুঙ্গি কোমরে বেঁধে কিংবা গামছা পরে রাস্তাটুকু পার হন সকলে। কখনও আবার ব্যাগের মধ্যে জামাকাপড় নিয়ে মাথায় করে পার হতে হয় রাস্তা। তারপর বসন্তহার পাকা রাস্তায় উঠে জামাকাপড় পরে নিজেদের কাজে যান তারা। আর এই সময়ে ওই রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করার কথা মহিলারা তো ভাবতেই পারেন না।

- Advertisement -

কিন্তু এভাবে কতদিন চলবে বলুন তো? একরাশ ক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন করলেন এক গ্রামবাসী। বোল্লা-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের পূর্ব মহেশপুর গ্রামে গেলেই দেখা যাবে সেই পরিস্থিতি। বাসিন্দা ফিরোজ সর্দার বলেন, দুদিনের বৃষ্টিতেই এখনও রাস্তায় জমে আছে জলকাদা। বর্ষাকাল এলে পরিস্থিতিটা কী হয় বুঝতে পারছেন তো? দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে এই দেড় কিলোমিটার রাস্তা পাকা করার জন্য আমরা কী না করেছি! ধারাবাহিক আন্দোলন, প্রশাসনের কাছে বারবার দাবি জানানো, মিটিং, মিছিল, পথ অবরোধ সবই হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, বিধায়ক, মন্ত্রী, প্রশাসনের কর্তারা থেকে এসে আমাদের বহুবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত নিট ফল শূন্য। বাধ্য হয়ে আমরা আগামী বিধানসভার ভোট বয়কটের চিন্তাভাবনা শুরু করেছি। তাঁর কথায় সুর মেলালেন বীতশ্রদ্ধ হাপন মুর্মু, জোসেফ মুর্মু, ফুলমণি হাঁসদা, মুজিবর রহমানরা।

তবে শুধু মহেশপুর গ্রামই নয়, বসন্তহারের পাকা রাস্তা থেকে রেল লাইন পেরিয়ে ওই কাঁচা রাস্তা দিয়ে যাতায়াত করেন এলাকার পূর্ব মহেশপুর, স্বজনপুর, বদলপুর সহ একাধিক গ্রামের মানুষজন। শুকনো মরশুমে এই রাস্তায় চলাচল করা গেলেও বৃষ্টি হলে কিংবা বর্ষাকালে তার পুরো নরকদশা হয়। পূর্ব মহেশপুর গ্রামের প্রথম অংশে বেশ কয়েবছর আগে কিছুটা ইট সোলিং করা হলেও তারপর আর কিছু হয়নি। বর্তমানে ইট সোলিংয়ে রাস্তার অনেক জায়গাও ভেঙে বসে গিয়েছে।

আরেক বাসিন্দা মুজিবর রহমান বলেন, পূর্ব মহেশপুর, স্বজনপুর ইত্যাদি গ্রামের কোনও আত্মীয়স্বজন এখন আর ভুল করেও এই পথ মাড়িয়ে কুটুমবাড়ি আসার দুঃসাহস দেখান না। গ্রামবাসীদের অনেকেরই আক্ষেপ, শুধুমাত্র বেহাল রাস্তার জন্য বাইরের গ্রামের লোকজন আমাদের গ্রামে সহজে ছেলেমেয়ের বিয়ে দিতে চান না। আরেক গ্রামবাসী ইমরান সর্দার বলেন, এখানেই দুর্ভোগের শেষ নয়। খুব বৃষ্টি হলে রাস্তায় কাদা জমে গেলে আমরা বসন্তহার গ্রামে কারও বাড়িতে নিজেদের বাইক, সাইকেল, ঠেলাগাড়ি রেখে আসতে বাধ্য হই। রীতিমতো বাড়ির মালিকদের হাতে-পায়ে ধরে আমরা তাঁদের রাজি করাই। কারণ, ওই রাস্তা তখন আর যানবাহন চলার যোগ্য থাকে না। তারপর যতদিন না রাস্তার কাদা শুকোয়, ততদিন অবধি সেগুলি অন্যদের বাড়িতেই থাকে।

গ্রাম থেকে প্রতিদিন কাজের জন্য শহরে আসা মাজিদুর সর্দার জানালেন, এই রাস্তা পাকা করার জন্য দীর্ঘদিন ধরে আমরা আবেদন জানিয়ে ক্লান্ত ও হতাশ। পাকা রাস্তা করার আগে আপাতত কোনওরকমে যাতায়াতের জন্য অন্তত ১০০ দিনের কাজের প্রকল্পে কিছু মাটি ও বালি রাস্তায় ফেললেও পারে। কিন্তু সেদিকেও প্রশাসনের নজর নেই। পূর্ব মহেশপুরের বাসিন্দা আসিদুল মোল্লা জানালেন, আমরা নিরুপায়। ভোট বয়কট করা ছাড়া আর কোনও রাস্তাই আমাদের সামনে খোলা নেই। আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। লকডাউন ওঠার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে রাস্তা নিয়ে আবার আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন এলাকার ভুক্তভোগী বাসিন্দারা।

এ বিষয়ে এলাকার বিধায়ক ও উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দপ্তরের রাষ্ট্রমন্ত্রী বাচ্চু হাঁসদা বলেন, পূর্ব মহেশপুরের রাস্তার বিষয়টি আমি জানি। রাস্তা পাকা করে দেওয়ার কথাও দিয়েছিলাম। কিন্তু এলাকার মানুষ রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখানোয় বিষয়টি জেলা শাসক দেখছেন। এখন আর তা আমার হাতে নেই। এর আগে রাস্তার বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রশাসনে মিটিংও হয়েছে। আমি এর আগেও জেলা শাসকের সঙ্গে মিটিংয়ে বিষয়টি বলেছি। আগামীতে মিটিং হলে আরও ভালোভাবে বিষয়টি তুলে ধরব।