সাইকেলে ঘোরা ডাক্তারবাবুরাই ভরসা গ্রামেগঞ্জে

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : শহর হোক কী গ্রাম, করোনা আতঙ্কে তটস্থ সকলেই। আর কোথাও কোথাও আবার এই আতঙ্কের সঙ্গী হয়েছে গুজবও। ফলে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে যাওয়া অবধি বন্ধ করে দিয়েছেন কিছু মানুষ। এদিকে লকডাউনের জেরে বন্ধ ডাক্তারদের প্রাইভেট চেম্বারগুলিও। সবমিলিয়ে সমস্যায় পড়েছেন রোগীরা। প্রশাসন সূত্রে খবর, ইতিমধ্যেই চালু হয়েছে অনলাইন চিকিৎসা পরিষেবা। কিন্তু তা কাজেই আসছে না প্রত্যন্ত গ্রাম ও বস্তি এলাকাগুলিতে। সংক্রমণের ভয়ে হাসপাতালেও যেতে নারাজ তাদের অধিকাংশই। ফলে এই মুহূর্তে ওই বিপন্ন রোগীদের কাছে একমাত্র সহায় হাতুড়ে চিকিৎসকরা। সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো ডাক্তারবাবুদের কাছ থেকে যে ওষুধ মিলছে, তা দিয়ে নমো নমো করে কাজ চালাচ্ছেন রোগীরা। আবার অনেকেই দ্বারস্থ হচ্ছেন কবিরাজদের। লতাপাতার নির্যাসেই সেখানে চলছে চিকিৎসা।

করোনা আতঙ্কে পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক যে, মেডিকেল কলেজ থেকে শুরু করে জেলা হাসপাতাল এমনকি ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের আউটডোর কোথাও রোগীর ভিড় নেই। হাসপাতালের তরফে জানানো হয়েছে, যেখানে লকডাউনের আগে হাজারের উপর রোগী আসতেন, সেখানে সেই সংখ্যাটা এখন মেরেকেটে ১০০ পর্যন্তও পৌঁছাচ্ছে না। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছে, মানুষ কি তাহলে এখন কম অসুস্থ হচ্ছেন নাকি অন্য কোনও কারণ রয়েছে ওই পরিবর্তনের পেছনে। এ বিষয়ে রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অধ্যক্ষ দিলীপকুমার পাল বলেন, আউটডোরে দিনে ১০০-র মতো রোগী হচ্ছে। মূলত যানবাহন না থাকাতেই এই পরিস্থিতি। একই কথা বললেন সহকারী অধ্যক্ষ প্রিয়ঙ্কর রায়। কিন্তু শুধুমাত্র কি যানবাহনের সমস্যার জন্যই হাসপাতালে রোগী কমেছে। যেখানে চিকিত্সকদের প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ, সেখানে তো হাসপাতালে আরও বেশি ভিড় হওয়ার কথা। সেটা হচ্ছে না কেন? এত রোগী কোথায় গেলেন?

- Advertisement -

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা মিলল গৌরী গ্রাম পঞ্চায়েতের রহমতপুরের বাসিন্দা আকতার আলির। চারমাস ধরে তিনি সুগার সহ বিভিন্ন রোগে ভুগছেন। তিনি বলেন, রায়গঞ্জ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়মিত ডাক্তার দেখাই। কিন্তু করোনা সংক্রমণের ঘটনার পর আর হাসপাতাল মুখো হইনি। হাসপাতালে দুনিয়ার রোগী। ওখানে কি মরতে যাব? করোনা ধরলে কে বাঁচাবে? শুধুমাত্র আকতার আলিই নন, একই আতঙ্ক দেখা গেল রায়গঞ্জ শহরের অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই। করোনা সংক্রমণের ভয়ে কেউই হাসপাতালের দিকে পা বাড়াচ্ছেন না। তবে কি ওই রোগীদের প্রত্যেককেই চিকিৎসা ছাড়া দিন কাটাতে হচ্ছে? কিন্তু পরিস্থিতি যে আদৌ সেরকম নয়, তা ভালোই টের পেয়েছেন চিকিৎসাকরা। রায়গঞ্জের মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসক কায়েম গোলদার বলেন, হাতুড়ে চিকিৎসকরা রোগীদের হয়ে ফোন করে ওষুধ জেনে নিচ্ছেন। বুঝতে পারছি, ওরা কত বড় ভূমিকা নিয়েছে! প্রত্যন্ত গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, লকডাউনের পর থেকে আমরা সাইকেলে ঘুরে বেড়ানো ডাক্তারবাবুর পরামর্শ মেনেই চলছি। ওঁরাই ওষুধের ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন। কেন শহরে ডাক্তারবাবুদের ফোন করে কথা বলছেন না? বাহিন গ্রাম পঞ্চায়েতের লৌহুজ গ্রামের বাসিন্দা রমজান হোসেন বলেন, কোন কথায় কী বলবেন বুঝতে পারব না।

রমজানের সাধারণ একটি মোবাইল ফোন থাকলেও অনেকের তাও নেই। তাই তাঁদের কাছে অনলাইন চিকিৎসারও কোনও মূল্য নেই, জানালেন কায়েম গোলদার। তিনি আরও বলেন, গ্রামীণ মানুষের চিকিৎসা অনলাইনে সম্ভব নয়। আর তাছাড়া একজন রোগী এলে তাঁর প্রেশার তো অন্তত দেখা দরকার। সেটা কি ফোনে সম্ভব? তাই এই পরিস্থিতিতে ভরসা হয়েছেন হাতুড়ে চিকিৎসকরাই। রায়গঞ্জ শহরের প্রত্যন্ত গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা ঘুরে তারা সাধ্যমত পরামর্শ দিচ্ছেন। আটকে গেলে প্রেসক্রিপশনের নম্বর দেখে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। রায়গঞ্জের কালীবাড়ি গ্রামের বাসিন্দা পেশায় হাতুড়ে চিকিৎসক মহম্মদ আলম জানিয়েছেন, লকডাউনের কয়েকদিন পর থেকেই রোগীর বাড়ির হাঁকডাক বেড়েছে। অনেকেই সটান বাড়িতে হাজির হচ্ছে। উপায় নেই দেখে ওষুধও দিতে হচ্ছে আমাদের।