নির্দেশিকা উড়িয়ে পড়ুয়াদের নিয়ে বিপজ্জনক যাতায়াত

সৌরভ দেব, জলপাইগুড়ি : গাড়ির পেছনের সিটের পরেই মালবহন করার জায়গায় চাপাচাপি করে বসে রয়েছে পাঁচ থেকে ছয়জন পড়ুয়া। পাহাড়পুরের দিক থেকে দ্রুতগতিতে আসা ওই গাড়ির পড়ুয়ারা শহরের একটি বেসরকারি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলের প্রাথমিক বিভাগের ছাত্র। অতিরিক্ত লাভের আশায় চালক মালবহনের জায়গায় একটি লোহার তৈরি বেঞ্চ বসিয়েছেন। সব মিলিয়ে ওই গাড়িতে ১২ থেকে ১৫ জন পড়ুয়া যাতায়াত করে। যদিও ওই গাড়ির মডেল অনুয়াযী ৮ জন বসার কথা।

পুলকারে অতিরিক্ত ছাত্রছাত্রী নিয়ে যাওয়ার এমন চিত্র জলপাইগুড়ি শহর এবং শহরতলি এলাকায় হামেশাই দেখা যাচ্ছে। পাহাড়পুর মোড় থেকে শুরু করে শহরের বিভিন্ন ট্রাফিক পয়েন্টে পুলিশ থাকলেও অতিরিক্ত স্কুল ছাত্র নিয়ে যাওয়া চালকদের কখনোই এই বিষয়ে সচেতন করা হয় না বলে অভিযোগ। এমনকি টোটোকে পুলকার হিসেবে ব্যবহার করা পুলিশের তরফে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলেও চালকদের একাংশ তা মানছেন না। এই বিষয়ে নজর নেই বলে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকার স্কুলবাস ও পুলকার নিয়ে নির্দেশিকা জারি করলেও বাস্তবে পরিস্থিতি কতটা বদলাবে তা নিয়ে সন্দিহান জলপাইগুড়ির বাসিন্দাদের একাংশ।

জলপাইগুড়ি শহরে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে ২০টির বেশি স্কুল রয়েছে। বেসরকারি স্কুলগুলির নিজস্ব বাসের পাশাপাশি অভিভাবকদের নিজেদের উদ্যোগে পুলকারে ছাত্র নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। অপরদিকে, কিছু সরকারি স্কুলেও শহরের বাইরে থেকে আসা ছাত্রছাত্রীর অভিভাবকরা নিজেদের উদ্যোগে পুলকারের ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু এই পুলকারগুলো কতটা নিরাপদ তা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। কারণ প্রাইভেট নম্বরের হওয়ায় একবার ফিটনেস টেস্টের পর কিছু বছর তা নবীকরণ করার প্রয়োজন হয় না। কাজেই গাড়ির দশা নিয়ে প্রশাসনের কাছে কোনও তথ্য থাকে না। শুধু তাই নয়, কিছু পুলকার বহনক্ষমতার থেকে বেশি পড়ুয়া নিয়ে যাতায়াত করছে। ৮ আসনের একটি গাড়িতে ১২ থেকে ১৬ জন পড়ুয়া নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি হুগলিতে একটি পুলকার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নয়ানজুলিতে পড়ে গিয়ে কয়েকজন শিশু গুরতর জখম হয়। তাদের মধ্যে এক খুদে ছাত্র ঋষভ সিংয়ে শনিবার ভোরে মৃত্যু হয়েছে। সূত্রের খবর, নির্দিষ্ট সময়ে শিশুদের স্কুলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য দ্রুতগতিতে চলার জেরে দুর্ঘটনাটি ঘটে। অন্যদিকে, কিছুদিন আগে পড়ুয়াদের নিয়ে একটি পুলকার শিলিগুড়ির কাছে ফুলবাড়ি ক্যানালে পড়ে যায়। সেসময় স্থানীয় বাসিন্দাদের তৎপরতায় কোনও ক্ষতি হয়নি। ফুলবাড়ির ঘটনার পর জলপাইগুড়িতে পুলিশ তৎপর হয়েছিল। সেই সময় পুলকার চালকদের নিয়ে সদর ট্রাফিক অফিসে সচেতনতা শিবির হয়। কিন্তু কিছুদিন কাটতেই সব আগের মতো হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের একাংশের বক্তব্য, কেন দুর্ঘটনার পরেই সচেতনতা শিবির হয়। কিছু হওয়ার আগেই কেন পদক্ষেপ করা হয় না, তা নিয়ে তাঁরা প্রশ্ন তুলছেন।

প্রাণতোষ মজুমদারের ছেলে শহরের একটি বেসরকারি স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে। তিনি বলেন, একটি পুলকার আমার ছেলেকে দুবছর স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা নিয়মিত চালককে গাড়ি আস্তে চালানোর কথা বলি। হুগলির ঘটনার পরে আমরা উদ্বিগ্ন। চালকের দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করার বিষয়টি দেখাটা পুলিশের দায়িত্ব। শহরের একটি বেসরকারি স্কুলের কর্তা বলেন, আমাদের পড়ুয়াদের নিয়ে যাতায়াত করা স্কুলবাসের চালক এবং কর্মীদের নিয়ে নিয়মিত বৈঠক করি। চালককে ধীরে, আইন মেনে চালাবার পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি শিশুদের য়ত্ন সহকারে বাসে ওঠানো এবং নামানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। অভিভাবকদের সঙ্গে বৈঠকেও স্কুলবাস পরিষেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়।

এ প্রসঙ্গে জলপাইগুড়ি ডিস্ট্রিক্ট স্কুল পুলকার অ্যাসোসিয়েনের সভাপতি দীপঙ্কর বসু বলেন, সম্প্রতি আমাদের সংগঠনের ফাউন্ডেশন ডে ছিল। সেখানে আমরা হুগলির ঘটনাটি তুলে ধরে চালকদের সচেতন করেছি। এটা ঠিক যে কিছু চালক অতিরিক্ত পড়ুয়া নিয়ে যাতায়ত করছেন। এই অভিযোগ আমাদের কাছেও রয়েছে। আমরা চাইব প্রশাসন তাঁদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করুক। অন্যদিকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওয়াই শ্রীকান্ত বলেন, চালকদের নিয়ে সচেতনতা শিবির নিয়মিত হয়। সেখানে পুলকার চালকরাও থাকেন। যেসব পুলকার অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে আইন ভাঙবে, পুলিশ তাদের চিহ্নিত করে কড়া ব্যবস্থা নেবে।