চলন্ত ওয়াগনের কয়লায় ভাতের জোগান

126

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : বাইরে থেকে দেখে ওয়াগনগুলি খালি মনে হলেও ওরা জানে ভেতরে রয়েছে ওদের ভাতের জোগান। ওরা জানে, কয়লা নামিয়ে  ফেরত আসা খালি ওয়াগনের এক একটা বগির মেঝেতে যে পরিমাণ কয়লা পড়ে রয়েছে তা বেচে একটা দিন সপরিবারে ভাত খেয়ে ঢেঁকুর তোলা যায়। তবে এ পথে প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে দিন-দিন। বাড়ছে কয়লা সংগ্রহে যুক্তদের সংখ্যা। ওয়াগন ঢুকতে দেখলেই ওদের আগে  চিন্তা হয়, বগি দখল করতে পারা যাবে তো? কারণ বগি দখল করতে না পারলে মিলবে না পড়ে থাকা কয়লা সংগ্রহের সুযোগ। তাই কয়লা নামিয়ে ফেরত আসা ওয়াগন স্টেশনে ঢুকলেই লাফিয়ে লাফিয়ে চলন্ত ওয়াগনেই উঠে পড়ে ওরা। শুরু হয় ওয়াগনে পড়ে থাকা অবশিষ্ট কয়লা সংগ্রহ। স্টেশনে ঢোকার মুখে লাফিয়ে ওয়াগনের বগিতে যে আগে উঠতে পারবে, সেই বগি তার। বীরপাড়ার দলগাঁও, মাদারিহাট-বীরপাড়া ব্লকের শিশুবাড়ির মুজনাই রেলস্টেশনে কয়লা সংগ্রহকারীদের মধ্যে এটাই অলিখিত নিয়ম।

কে নেই ওদের দলে? কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে প্রৌঢ়া, এমনকি বৃদ্ধারাও। বৃদ্ধারা অবশ্য ওয়াগনে উঠতে পারেন না। তাঁরা নীচে দাঁড়ান ব্যাগ নিয়ে ভেতর থেকে বাইরে কয়লার টুকরো ছুড়তে থাকে ছেলে। বাইরে দাঁড়িয়ে প্রৌঢ়া, বৃদ্ধারা ব্যাগ, বস্তায় তা ভরতে থাকেন। তবে ওয়াগনের বগি দখলের কাজটা করে কমবয়সিরাই। দলগাঁও রেলস্টেশনে ঢোকার মুখে বীরপাড়া-লঙ্কাপাড়া রোডের লেভেল ক্রসিং, মুজনাই রেলস্টেশনে ঢোকার মুখে গোপালপুর রোডের লেভেল ক্রসিং থেকে চলন্ত ওয়াগনে লাফিয়ে উঠতে থাকে ওরা। ওরা বিলক্ষণ জানে, কোন ওয়াগন কোন স্টেশনে অন্য ট্রেনকে পাস দেওয়ার জন্য দাঁড়াবে। সেইমতো প্রস্তুত থাকে ওরা। দখলদারি নিয়ে নিজেদের মধ্যে আকছার ঝগড়াঝাঁটি লেগেই থাকে ওদের মধ্যে।

- Advertisement -

এভাবে চলন্ত ওয়াগনে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে এর আগে জখম হয়েছে অনেকেই। হয়েছে মৃত্যুও। তবু বন্ধ হয়নি ওয়াগন থেকে কয়লা সংগ্রহ করার কারবার। ২০১৮ সালে মুজনাই রেলস্টেশনে ওয়াগন থেকে কয়লা সংগ্রহ করতে গিয়ে দুই বগির জোড়ের অংশে উঠেছিলেন স্টেশন সংলগ্ন  চাঁপাগুড়ির এক যুবক। হঠাৎই জোড়ের ফাঁকে ঢুকে যায় তাঁর একটি পা। ওই স্টেশনেই ওয়াগন থেকে  কয়লা সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্য একটি দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হয়ে একটি পা হারিয়েছেন ওই  এলাকারই আরেক ব্যক্তি। ২০১৮ সালের এপ্রিল মাসে মুজনাই স্টেশনেই ওয়াগনে লাফিয়ে উঠতে গিয়ে পড়ে গিয়ে এক মহিলার মৃত্যু হয়। তবুও বন্ধ হয়নি ওয়াগন থেকে কয়লা সংগ্রহ করার কারবার।

দলগাঁও ও মুজনাই রেলস্টেশন সংলগ্ন কিছু পরিবারের একমাত্র পেশাই হল ওয়াগন থেকে কয়লা সংগ্রহ করে বিক্রি করা। কিন্তু জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাঁরা কয়লা সংগ্রহ করছেন, তাঁদের চেয়ে অনেক বেশি লাভবান হচ্ছে অন্য একটি চক্র, খবর স্থানীয় সূত্রের। কয়লা সংগ্রহকারীদের কাছে অল্প দামে কিনে নিয়ে ওই চক্রটি কয়েকগুণ বেশি দামে কয়লাগুলি অন্যত্র কালোবাজারে বিক্রি করে মুনাফা লুঠছে। তবে এভাবে কয়লা সংগ্রহকারীদের বক্তব্য, দারিদ্র‌্যের কারণে ওই কাজ করতে বাধ্য হন তাঁরা। বীরপাড়ার কয়লা সংগ্রহকারী এক যুবকের বক্তব্য, কী কাজ করব? কে দেবে কাজ? বাইরে গিয়ে কাজের নিশ্চয়তাও নেই। তাই কয়লা কুড়িয়ে বিক্রি করি। জানি এতে যে কোনও মুহূর্তেই মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু পেট তো কথা শোনে না। আরপিএফের হাসিমারার ওসি সুশীলকুমার মণ্ডল বলেন, এসব তো আমরা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। হয়তো ফের শুরু হয়েছে। আমি খোঁজখবর নিচ্ছি।