টিকার বৈষম্যে বঞ্চিত জনতা, কর্পোরেট দাপটে কোণঠাসা অন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠান

138

নয়াদিল্লি ও কলকাতা : আপনার ধারে-কাছে অ্যাপোলো হাসপাতাল আছে? নিদেনপক্ষে ফর্টিস, মেডিকা বা নারায়ণা হ্রুদয়ালয়ের মতো কর্পোরেট হাসপাতাল? অথবা এসব হাসপাতালে যাওয়ার মতো আর্থিক সংগতি আছে কি আপনার? এই দুটি শর্তের কোনোটি আপনার নাগালে না থাকলে বেসরকারি উদ্যোগে টিকাকরণের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা আপনার থাকবে না।

করোনা সংক্রমণের বর্তমান ভয়াবহতার মাঝে টিকাকেই যখন একমাত্র অগতির গতি বলা হচ্ছে, তখন সবচেয়ে বড় সমস্যা টিকার ভয়ানক আকাল তো আছেই। গোদের ওপর বিষফোড়ার মতো নতুন সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে টিকার জোগানে বৈষম্য। বিশেষ করে বেসরকারি ক্ষেত্রে এই বৈষম্য চরমে।

- Advertisement -

দেশের বেসরকারি হাসপাতালগুলির মধ্যে মাত্র ৯টির হাতে চলে গিয়েছে বরাদ্দের ৫০ শতাংশ টিকা। এই নয়টি গ্রুপ হাসপাতাল। প্রতিটি গ্রুপের আওতায় একাধিক হাসপাতাল আছে। যেমন, শুধু অ্যাপোলো গ্রুপে হাসপাতালের সংখ্যা নয়। কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বশেষ টিকা নীতিতে দেশে মোট টিকা উৎপাদনের ২৫ শতাংশ বরাদ্দ শুধুমাত্র বেসরকারি হাসপাতালের জন্য। কিন্তু বেসরকারি ক্ষেত্রের এই বরাদ্দের অর্ধেক দখল করে নিয়েছে উল্লিখিত ৯টি বড় হাসপাতাল।

বাকি অর্ধেক ভাগাভাগি করে নিয়েছে দেশের আরও ৩০০টি হাসপাতাল। যেগুলির অবস্থান হয় অধিকাংশ মেট্রো বা টিয়ার-ওয়ান সিটিতে। ফলে গ্রামাঞ্চল তো পরের কথা, ছোট, মাঝারি কিংবা জেলা শহরগুলিতেও বেসরকারি টিকাকরণের সুযোগ এখনও অধরাই। বাংলায় এই সুযোগ যেটুকু আছে, তার ৯৯ শতাংশেরও বেশি সীমাবদ্ধ কলকাতা শহরে।

উত্তরবঙ্গের চিত্রটা, এমনকি শিলিগুড়ি শহরেও খুব করুণ। শিলিগুড়ির নেওটিয়া হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কোভিশিল্ড ও কোভ্যাকসিন নির্মাতাদের কাছে চেয়ে এখনও কোনোটিই পায়নি। হাসপাতালটির শিলিগুড়ির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৬ জুনের আগে টিকা পাওয়া সম্ভব নয় বলে উৎপাদক সংস্থাগুলি তাদের জানিয়ে দিয়েছে। শিলিগুড়িতে মেডিকা কর্তৃপক্ষ পেয়েছে ৫০ হাজার কোভিশিল্ড। তরাই লায়ন্স ব্লাড ব্যাংক পেয়েছে ১২ হাজার কোভিশিল্ড।

জলপাইগুড়ি শহরে একটি নামকরা প্যাথলজিক্যাল চেন ল্যাবে টিকাকরণ শুরু হয়েছে শনিবারই। রোজ ১০০ জন টিকা পাবেন এই কেন্দ্র থেকে। অন্যদিকে, কোচবিহারের একটি বেসরকারি হাসপাতালের জেনারেল ম্যানেজার পলাশ গুছাইত চৌধুরী বলেন, প্রায় এক মাস আগে আমরা টিকা চেয়ে সিরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেককে মেল করেছিলাম। কিন্তু আমাদের জানানো হয়, ওদের স্টক নেই। কবে নাগাদ আমাদের ওরা টিকা দিতে পারবে, তাও নির্দিষ্টভাবে জানাতে পারেনি। আলিপুরদুয়ার, মালদা, রায়গঞ্জ, বালুরঘাট কিংবা ইসলামপুরে বেসরকারি টিকাকরণের এখনও কোনও খবরই নেই।

এই চিত্র কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণের বাইরে প্রায় সব হাসপাতালের। কলকাতার একটি তুলনায় ছোট বেসরকারি হাসপাতালের সূত্রে জানা গিয়েছে, কমপক্ষে ১ লক্ষ ডোজের বরাত না দিলে গ্রহণই করছে না টিকা উৎপাদক সংস্থাগুলি।  এই শর্তে দেশের প্রায় ৯৯ শতাংশ বেসরকারি হাসপাতাল ভ্যাকসিন কেনার পরিস্থিতিতেই আসতে পারেনি। মুম্বইয়ে হিন্দু সভা হাসপাতালের মেডিকেল ডিরেক্টর দেওগিরকর বলেন, আমরা ৩০ হাজার ডোজের বরাত দিয়ে পেয়েছি মাত্র ৩,০০০ ডোজ। বড় নেটওয়ার্কের কর্পোরেট হাসপাতালগুলি উৎপাদকদের সঙ্গে বড় বড় চুক্তি করে ফেলছে।

প্রগ্রেসিভ নার্সিংহোম অ্যান্ড হসপিটালস অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শেখ আলহাজউদ্দিন বলেন, প্রতিদিন একটা নার্সিংহোম খুব বেশি হলে ২০০ জনকে টিকা দিতে পারে। অর্থাৎ মাসে ৬ হাজার টিকা দেওয়ার ক্ষমতা আছে। তাহলে তারা ১ লক্ষ ডোজ কিনে কী করবে? এই সংগঠনটির আওতায় রাজ্যের ২৩টি জেলায় ১,৬০০-র বেশি নার্সিংহোম আছে। আলহাজউদ্দিন বলেন, করোনা মোকাবিলায় ছোট হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির বিরাট ভূমিকাকে কেউই স্বীকৃতি দিচ্ছে না। অথচ আমরা ভর্তি না নিলে বহু মানুষ চিকিৎসার অভাবে মারা যেতেন।

পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বেঙ্গল চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিসিআই) এবং ফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ফিকি)-র মাধ্যমে রাজ্যের জেলাগুলিতে ছড়িয়ে থাকা বেসরকারি হাসপাতাল ও নার্সিংহোমগুলির কাছ থেকে তাদের প্রয়োজন জেনে একসঙ্গে প্রস্তুতকারী সংস্থার কাছে টিকার অর্ডার দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে রাজ্য সরকার। সোমবার কোভিশিল্ড প্রস্তুতকারী সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়া ও রাজ্য সরকারের সঙ্গে বণিকসভাগুলি এ ব্যাপারে বৈঠকে বসছে।

বিসিসিআইয়ের ডিরেক্টর অঙ্গনা গুহ রায়চৌধুরী বলেন, আমরা রাজ্যে কয়েকটি নোডাল বেসরকারি টিকাকরণ কেন্দ্র তৈরির চেষ্টা করছি। সেগুলির মাধ্যমে অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলি একসঙ্গে অর্ডার দিতে পারবে। দেশে এখন নথিভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৪৩,৪৮৬। এগুলির মধ্যে মাত্র ৯টি কর্পোরেট হাসপাতালের হাতে রয়েছে বেসরকারি ক্ষেত্রের জন্য বরাদ্দের ৫০ শতাংশ। বাকি ৫০ শতাংশ পেয়েছে মেট্রো ও টিয়ার-ওয়ান সিটির ৩০০ হাসপাতাল।

এর বাইরে প্রায় ৪৩ হাজার বেসরকারি হাসপাতাল এই টিকা-বৈষম্যের শিকার। তাছাড়া বিপুল বৈষম্য আছে শহর ও গ্রামাঞ্চলের মধ্যে তো বটেই, মেট্রো ও টিয়ার-ওয়ান সিটির সঙ্গে অন্য শহরগুলিরও। ছোট, মাঝারি হাসপাতালগুলি যখন চেয়ে পাচ্ছে না, সেখানে বড় হাসপাতালগুলি বরাতের চেয়ে বেশি টিকা পাচ্ছে, এমন ঘটনাও সামনে আসছে। যেমন বেঙ্গালুরুর অ্যাপোলো হাসপাতাল ৪৮ হাজার কোভিশিল্ডের বরাত দিয়ে পেয়েছে ২ লক্ষ ৯০ হাজার টিকা। দিল্লির ম্যাক্স হেলথকেয়ার ১ লক্ষ কোভিশিল্ডের বরাত দিয়ে পেয়ে গিয়েছে ২ লক্ষ ৯০ হাজার ডোজ।

দেশের ৬টি বড় শহর- দিল্লি, মুম্বই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, হায়দরাবাদ ও পুনের হাতে চলে গিয়েছে বেসরকারি ক্ষেত্রে বরাদ্দ টিকার ৮০.০৩ শতাংশ। সিরাম ইনস্টিটিউট পুনেতে আছে বলে মহারাষ্ট্র পেয়েছে বেসরকারি ক্ষেত্রে বরাদ্দ কোভিশিল্ডের ২৮ শতাংশ। একই কারণে তেলেঙ্গানা পেয়েছে কোভ্যাকসিনের ৩১.৮ শতাংশ। দেশের বাকি শহর বা গ্রামের লোকদের তো বটেই, ৪০ হাজার বেসরকারি হাসপাতালেরও এখন কার্যত কলা চোষার দশা।

বেসরকারি ক্ষেত্রে এই বৈষম্য তৈরি হয়েছে মে মাসের শুরুতে কেন্দ্রের নয়া টিকা নীতি ঘোষণা হওয়ার পর। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মে মাসে সারাদেশে বেসরকারি ক্ষেত্রে বরাদ্দ ১ কোটি ২০ লক্ষ ডোজের মধ্যে উল্লিখিত ৯টি কর্পোরেট হাসপাতালের হাতেই চলে গিয়েছে ৬০ লক্ষ ৫৭ হাজার ডোজ। কেন্দ্রীয় সরকারের পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মে মাসে বেসরকারি হাসপাতালগুলি ১ কোটি ২০ লক্ষ ডোজ হাতে নিলেও ব্যবহার করেছে মাত্র ২২ লক্ষ ডোজ, অর্থাৎ বরাদ্দের মাত্র ১৮ শতাংশ।

এই একইসময়ে অর্থাৎ মে মাসে কেন্দ্রীয় সরকারের ভাগে যে ৫০ শতাংশ পড়েছিল, তার পরিমাণ ৪ কোটি ৩ লক্ষ। রাজ্যগুলি পেয়েছে ২ কোটি ৬৬ লক্ষ ডোজ (বরাদ্দের ৩৩.৫ শতাংশ)। কেন্দ্রীয় সরকার সিরাম ইনস্টিটিউট ও ভারত বায়োটেকের কাছ থেকে দুটি টিকাই ১৫০ টাকা দরে কিনছে। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালগুলিকে কোভিশিল্ড কিনতে হচ্ছে ৬০০ টাকা দরে আর কোভ্যাকসিন ১,২০০ টাকা দামে।

টিকা দেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দাম নেওয়ার কোনও নিয়ম এখনও নেই বলে দামেও বৈষম্য থাকছে। জলপাইগুড়ি ও শিলিগুড়িতে একটি চেন প্যাথলজিক্যাল ৯০০ টাকা প্রতি ডোজ কোভিশিল্ডের দাম নিচ্ছে। শিলিগুড়িতে অন্য একটি সংস্থা আবার কোভিশিল্ড দিচ্ছে ৮০০ টাকা দামে। বেঙ্গালুরুর ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের অ্যাসোসিয়েট প্রফেসার তেজাল কান্তিকরের বক্তব্য, এই দাম শহরের কিছু বাসিন্দার কাছে সমস্যার না হতে পারে, কিন্তু নিম্নবিত্ত ও গরিবের পক্ষে এই টাকা খরচ করে টিকা নেওয়া সম্ভব নয়।