নোংরা ঘেঁটে জীবন চলে, ভোটের খোঁজে ওদের কী !

94

দিব্যেন্দু সিনহা, জলপাইগুড়ি : এখন চারদিক ভোট নিয়ে সরগরম। চলছে দেওয়াল লিখন থেকে পোস্টার-ব্যানার এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে প্রচার। কোন দল সরকারে আসবে তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে চুলচেরা বিশ্লেষণের পাশাপাশি অনেকে তর্কবিতর্কেও জড়িয়ে পড়ছেন। এককথায় জমজমাট পরিস্থিতি। কিন্তু এর বাইরেও এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের কাছে ভোটের কোনও বিশেষ অর্থ নেই। বছরের বেশিরভাগ সময় তাঁরা এই রাজ্যে থাকলেও এখানকার ভোট নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনও মাথাব্যথা দেখা যায় না। কারণ, তাঁরা  কোনও সরকারি সুবিধা পান না। শুধু তাই নয়, নিজের রাজ্যের ভোট নিয়ে তাঁদের আগ্রহ নেই। তাঁরা হল মহারাষ্ট্র থেকে আসা নেহেড়াওয়ালার দল।

জলপাইগুড়ি শহরের সোনাপট্টি বা সোনার গয়না তৈরির দোকানগুলির সামনে সকাল সকাল গেলে দেখা যায়, কিছু পুরুষ-মহিলা দোকানের সামনে ধুলো পরিষ্কার করে এক জায়গায় করছেন। কেউ আবার দোকানের সামনের নিকাশি থেকে কাদামাটি তুলে ড্রামে ভর্তি করছেন। হঠাৎ করে দেখলে যে কেউ বলবেন, পুরসভার সাফাই বিভাগের কর্মীরা কাজ করছেন। কিন্তু পরে ওই ধুলো থেকে রামকুমার ভিমসে, রাজেশ নেতাম বা রাম সগুন নেতামরা যখন সোনা বের করেন তখন অধিকাংশ মানুষের চোখ কপালে ওঠে।

- Advertisement -

গত ৪০ বছর ধরে জলপাইগুড়ির পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের জয়ন্তীপাড়ায় আছেন রামকুমার ভিমসে, রাজেশ নেতাম বা রাম সগুন নেতামরা। যাঁদের শহরের মানুষজন নেহেড়াওয়ালা বলে জানেন। তাঁরা আদতে মহারাষ্ট্রের গান্দিয়া জেলার প্রত্যন্ত দোঙ্গারপুর থেকে এসেছেন। এখন রেলের জমিতে মোট ৭টি পরিবারের বাস। ধুলো ঝেড়ে বা কাদা থেকে সোনা বের করাই তাঁদের প্রধান পেশা। বছরে ১২ মাসের মধ্যে ৯ মাসই জলপাইগুড়িতে থাকেন তাঁরা।

সোনার কথা শুনলে অনেকেই মনে করবেন, আর্থিক দিক থেকে পরিবারগুলি অনেকটাই সচ্ছল। কিন্তু বাস্তবে ঠিক উলটো বলে জানিয়েছেন পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের প্রাক্তন কাউন্সিলার নারায়ণ সরকার। তিনি বলেন, কোনও একটা সময় এঁদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল। সেই সময় বিনামূল্যে ওই ধুলো এবং  নিকাশির মাটি নিয়ে আসত। এখন অনেক ক্ষেত্রে টাকার বিনিময়ে সেগুলি কিনে নিতে হয়। আর্থিক কারণে লকডাউনের সময় ওইসব পরিবারের প্রায় ৪০ জনকে খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে।

দীর্ঘ বছর ধরে ওইসব নেহেড়াওয়ালা এখানে থাকলেও সরকারি সাহায্য তেমন পান না। এমনকি ভোটের সময়ও রাজনৈতিক দলের সদস্যরা এঁদের খোঁজ করেন না। যেহেতু তাঁদের ভোটার কার্ড থেকে শুরু করে সব কাগজ ভিনরাজ্যের, তাই ভোটের প্রতিও তেমন আগ্রহ নেই এঁদের।

৫৫ বছর বয়সি রাম সগুন নেতামের কথায়, আমার বয়স যখন মাত্র ৬ বছর, তখন মা রুকমণি ভিমসের সঙ্গে এখানে আসি। সেই থেকে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে জলপাইগুড়িতে আছি। বছরে নমাসের বেশি সময় এখানেই থাকি। মাত্র ২-৩ মাসে নিজের গ্রামে যাই। আমাদের পরিবারের দুই-তিনটি শিশু জলপাইগুড়িতেই জন্মেছে। তিনি ছাড়াও প্রদীপ ভিমসে সহ আরও দুজন কিছু টাকা জমিয়ে জলপাইগুড়ি শহরের আদরপাড়ায় জমি কিনেছেন।

অন্যদিকে রাজেশ নেতাম বলেন, আমাদের এই কাজ করেই খেতে হবে। সাহায্য তো আর পাওয়া যায় না। সুতরাং, ভোট নিয়ে আগ্রহ দেখিয়ে কী লাভ! নিজের রাজ্যে ভোট হলেও তেমন খোঁজখবর রাখা হয় না। তবে পঞ্চায়ে ভোট হলে যাওয়ার চেষ্টা করি।

আসন্ন ভোট নিয়ে যখন উত্তেজনার পারদ চড়ছে, বিভিন্ন দলের নেতা-কর্মীরা যখন দিনরাত এক করে প্রচার চালাচ্ছেন, মোড়ে মোড়ে চায়ে দোকানে যখন জোর গলায় চলছে ভোটের চর্চা, তখন ভিনরাজ্য থেকে আসা দেশের নাগরিকরা অনেকটাই ব্যতিক্রমী। শুধু এ রাজ্যে কেন, তাঁদের নিজেদের রাজ্যের ভোট নিয়ে যে আগ্রহ নেই তা তাঁদের কথাতেই স্পষ্ট।