কাজ নেই, ঘরবন্দি ভুটিয়া বস্তির তেত্রিশটি পরিবার

222

ভাস্কর শর্মা, আলিপুরদুয়ার : হাতির হানার ভয়ে অনেকদিন ধরেই বন্ধ চাষাবাদ। সংসার চালানোর একমাত্র পথ ছিল নদী থেকে বালি-পাথর তোলা। লকডাউনে তাও বন্ধ। এই অবস্থায় বৃষ্টির মধ্যে গ্রাম থেকেই বের হতে পারছেন না বক্সা ব্যাঘ্রপ্রকল্পের জয়ন্তী নদী ঘেঁষা গ্রাম ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দারা। বর্ষায় কার্যত ঘরবন্দি ভুটিয়া বস্তির তেত্রিশটি পরিবার। রুটিরুজি হারিয়ে এখন সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে তাঁদের। তাই ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দারা চাইছেন বন দপ্তর দ্রুত তাঁদের পুনর্বাসন প্যাকেজ দিয়ে অন্যত্র সরানোর ব্যবস্থা করুক। তবে তার আগে এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে জেলা প্রশাসনের কাছে বিশেষ আর্থিক প্যাকেজের দাবিও জানিয়েছেন বাসিন্দারা।

আলিপুরদুয়ার শহর থেকে ছবির মতো জনপদ জয়ন্তীর পাশেই অবস্থিত ভুটিয়া বস্তি। জেলার কুমারগ্রাম ব্লকের তুরতুরিখণ্ড গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় ভুটিয়া বস্তির অবস্থান। ব্রিটিশ আমলে এই ভুটিয়া বস্তি এলাকাতেই হাজার হাজার মানুষ বসবাস করতেন। কিন্তু এলাকাটি বক্সা বাঘবনের মধ্যে এবং এলাকা থেকে ডলোমাইট উত্তোলন বন্ধ হওয়ার পর থেকেই সেখান থেকে বাসিন্দা সরে যেতে থাকেন। বর্তমানে ভুটিয়া বস্তিতে মাত্র তেত্রিশটি পরিবার আছে। জনসংখ্যা ১০১। স্বাধীনতার এত বছর পরেও এখানে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি বলে বাসিন্দাদের অভিযোগ। যদিও প্রশাসনের দাবি ভুটিয়া বস্তি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে অবস্থিত হওয়ায় ওখানে অন্য এলাকার মতো উন্নয়নমূলক কাজ করা সম্ভব নয়। তবুও স্থানীয় পঞ্চায়েতের থেকে রাস্তাঘাট, গৃহনির্মাণ সহ অন্যান্য উন্নয়নমূলক কাজ করা হচ্ছে। বাসিন্দাদের অভিযোগ প্রশাসন উন্নয়নমূলক কাজের কথা বললেও আদৌ তাঁরা তেমন সুযোগ সুবিধা পান না।

- Advertisement -

ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দাদের একটা সময় মূল জীবিকা ছিল কৃষিকাজ ও প্রাণী পালন। কিন্তু হাতির হানা অব্যাহত। অপরদিকে, জয়ন্তী নদীর পলিতে কৃষিজমি নষ্ট হয়ে গিয়েছে। তাই কৃষি কাজ হারিয়ে বাসিন্দারা বেছে নেন নদী থেকে বালি-পাথর  তোলার কাজ। কিন্তু আদালতের নির্দেশে দীর্ঘদিন ধরে জয়ন্তী নদী থেকে বালি-পাথর তোলাও বন্ধ হয়ে আছে। ফলে শ্রমিকের কাজ করেই জীবিকা নির্বাহ করেন এখানকার বাসিন্দা। বর্তমানে লকডাউন এবং বর্ষা শুরু হওয়ায় কাজ হারিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দারা।

ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দা বিক্রম মোঙ্গর বলেন, দীর্ঘদিন আগেই আমরা আমাদের মূল জীবিকা হারিয়েছি। কোনও মতে পাথর তুলে, শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালাতাম। কিন্তু লকডাউনের জন্য প্রায় চারমাস ধরে আমাদের সব কাজ বন্ধ। এখন সংসার চালানোই দায় হয়ে পড়েছে।

গৃহবধূ সুস্মিতা কুজুর বলেন, আমাদের এলাকার উন্নয়নে বন দপ্তর ও প্রশাসন বারবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু পঞ্চাশ বছর আগে যেমন ছিলাম এখনও তেমনি আছি। আমাদের দিকে শুধুমাত্র ভোট আসলে নেতারা তাকান। কিন্তু কোনও সাহায্য পাই না। ফলে এই করোনা পরিস্থিতিতে আমাদের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গিয়েছে। এই অবস্থায় প্রশাসন আমাদের আর্থিক সাহায্য না করলে আমরা শেষ হয়ে যাব।

স্থানীয় পঞ্চায়ে সদস্য সাজেন সোনার বলেন, আমি পঞ্চায়েত সদস্য হওয়ার পর এলাকার দুইজন ইন্দিরা আবাসের ঘর পেয়েছেন। এছাড়াও বেশকিছু ছোট রাস্তার কাজ হয়েছে। তবে আমাদের দাবি দ্রুত বন দপ্তর এখানকার বাসিন্দাদের প্যাকেজ দিয়ে অন্যত্র পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করুক। এদিকে স্থানীয় বাসিন্দাদের থেকে জানা গিয়েছে, দীর্ঘদিন আগেই ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এ বিষয়ে জয়ন্তী এলাকার বাসিন্দা অজয় রায় বলেন, গতবছরও বন দপ্তর ভুটিয়া বস্তির বাসিন্দাদের অন্যত্র সরানোর জন্য স্বঘোষণা পত্রে স্বাক্ষর করে। মাঝে মধ্যেই এমন উদ্যোগ নেওয়া হলেও আজও তাঁদের আর্থিক প্যাকেজ ও পুনর্বাসনের বিষয়ে কাজ এগোয়নি। বন দপ্তরের টালবাহানার জন্য বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ে বন দপ্তরের কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।