বৈশাখে ঘুড়ি উড়িয়ে লকডাউনে মুক্তি খুঁজছে গাজোল

গৌতম দাস, গাজোল : ঘুড়ি ওড়ানো বিনোদনের একটি অন্যতম অঙ্গ। বিনোদন ছাড়াও বিজ্ঞানের বিভিন্ন কাজে ঘুড়ি ব্যবহার করেছেন অনেক বিজ্ঞানী। ১৭৪৯ সালে ঘুড়িতে থার্মোমিটার লাগিয়ে আবহাওয়া বিষয়ক তথ্য জেনেছিলেন স্কটল্যান্ডের বিজ্ঞানী আলেকজান্ডার উইলসন। ১৭৫২ সালে বিদ্যুৎ ও বজ্রপাত বিষয়ক গবেষণার জন্য ঘুড়ি ব্যবহার করেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন। আবহবিদ্যা অধ্যয়নের জন্য ১৮৯৩ সালে বক্স ঘুড়ি আবিষ্কার করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানী লরেন্স হারগ্রেভ। এসব কথা প্রায় সবারই জানা। এভাবে নানা কাজে ব্যবহার করা হয়েছে ঘুড়ি।

তবে বর্তমান সময়ে শুধুমাত্র বিনোদনের জন্যই ঘুড়ি ওড়ানো হয়। বিশেষ করে বিশ্বকর্মাপুজোর দিন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় জমে ওঠে ঘুড়ির লড়াই। পেটকাটি, চাঁদিয়াল, ডায়মন্ড, ডেল্টা, শতরঞ্চি প্রভৃতি ঘুড়িতে ছেয়ে যায় বাংলার আকাশ। মাঝেমধ্যেই ভো-কাট্টা আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্তে। বিশ্বকর্মাপুজো ছাড়াও অন্য সময়ে যখন একটু হাওয়া বয়, তখন আকাশে ঘুড়ির দেখা পাওয়া যায়। তবে বৈশাখ মাসে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রচলন তেমন একটা নেই। কিন্তু করোনার দৌলতে এই সময়ে গাজোলের আকাশ ছেয়ে যাচ্ছে রংবেরং-এর ঘুড়িতে। ঘুড়ি ওড়াচ্ছে আট থেকে আশির দল। লকডাউনের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেতে ঘুড়ি ওড়ানোকে বেছে নিয়েছেন গাজোলের কৃষ্ণপল্লি এলাকার বেশ কিছু বাসিন্দা। ঘুড়ি ওড়ানোর জন্য তাঁরা বেছে নিয়েছেন গাজোল রেলস্টেশন সংলগ্ন ফাঁকা মাঠকে।

- Advertisement -

সকাল থেকেই রেলস্টেশন সংলগ্ন আকাশে উড়তে দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন মাপ ও ডিজাইনের হরেকরকম ঘুড়ি। তবে এই ঘুড়িগুলি এতটাই বড় যে, সুতো দিয়ে ওড়ানো সম্ভব নয়। এই সমস্ত ঘুড়ি ওড়াতে ব্যবহার করা হচ্ছে পাটের তৈরি সুতলি। শুধু দিনের বেলায় নয়, রাতের আকাশেও উড়ছে ঘুড়ি। ঘড়ির সঙ্গে সংযুক্ত করা হচ্ছে রংবেরংয়ে এলইডি ল্যাম্প। এতে রাতে আলোকমালায় সেজে উঠছে গাজোলের আকাশ। এদিন সকালে রেলস্টেশন সংলগ্ন ময়দানে গিয়ে দেখা গেল সেখানে হাজির হয়েছেন সব বয়সের মানুষ। আকাশে উড়ছে বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘুড়িটি হল কোয়ারা ঘুড়ি। তিনহাত লম্বা আর প্রায় আড়াইহাত চওড়া ঘুড়িটি তৈরি করা হয়েছে প্লাস্টিক শিট ও বাঁশের বাতা দিয়ে। এছাড়াও রয়েছে চিলের মতো দেখতে ঘুড়ি। এরোপ্লেনের মতো দেখতে ঘুড়ি।

বছর বাহাত্তরের হরেন্দ্রনাথ পাল নাতিপুতিদের সঙ্গে নিয়ে চলে এসেছেন ঘুড়ি ওড়াতে। তিনি বলেন, লকডাউনে বাড়ির মধ্যেই দিন কাটছিল। এভাবে বন্দি হয়ে থাকতে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। তখনই মাথায় আসে, কিছুটা সময় ফাঁকা মাঠে গিয়ে ঘুড়ি ওড়ালে কেমন হয়। এই ইচ্ছের কথা জানাই পরিবারের লোকদের। সবাই সম্মতি দেয়। এরপর কয়েকদিন ধরে বাড়িতে বসে তৈরি বিভিন্ন ধরনের ঘুড়ি তৈরি করেছি। তবে ঢাউস এই ঘুড়িগুলি সুতো দিয়ে ওড়ানো যায় না। এসব ওড়াতে দরকার হয় পাটের তৈরি সুতলির। হরেন্দ্রবাবু জানান, ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে যেন শৈশবের দিনগুলি ফিরে পাচ্ছেন তিনি। ছোটবেলায় ঘুড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত মাঠে। কিন্তু এখন একনাগাড়ে খুব বেশি সময় ধরে ঘুড়ি ওড়াতে পারেন না তিনি। বয়সজনিত কারণে কোমরে টান ধরে। তাই ঘুড়ি আকাশে পৌঁছে দিয়ে সুতলি ধরিয়ে দিচ্ছেন নাতিপুতিদের হাতে। প্রায় ৪০-৫০ মিটার দূরে দূরে দাঁড়িয়ে ঘুড়ি ওড়াচ্ছে তারা।

বাড়ির কচিকাঁচাদের নিয়ে ঘুড়ি ওড়াতে এসেছিলেন বিচিত্র হালদার। তিনিও জানান, লকডাউনের বন্দিদশা কাটাতে বাড়ির কচিকাঁচাদের নিয়ে খোলা জায়গায় চলে আসছেন ঘুড়ি ওড়াতে। ঘুড়ি ওড়াতে পেরে খুশি ঋক দাস, শুভ দাসদের মতো কচিকাঁচারা। রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে পথচলতি মানুষজনও একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখছেন নতুন নতুন ঘুড়ি। ঘুড়ি দেখে তারিফ করছেন তাঁরাও। সবমিলিয়ে লকডাউনের বন্দিদশা থেকে কিছুটা মুক্তি পেতে ঘুড়ি ওড়ানোকে বেছে নিয়েছেন গাজোলের বিভিন্ন এলাকার মানুষ।