অন্য গ্রামের গল্প, যেখানে রাজনৈতিক সংঘর্ষ হয় না

116

অভিজিৎ ঘোষ, আলিপুরদুয়ার : আলিপুরদুয়ার শহর থেকে প্রায় ৪০ কিমি দূরে ছোট্ট গ্রাম কোদাল বস্তি। চিলাপাতা জঙ্গলের এক কোনায় কালচিনি ব্লকের এই গ্রাম যেন রাজ্যের সব গ্রামের থেকে আলাদা। বিধানসভা ভোটের মুখে বিভিন্ন জায়গায় যখন রাজনৈতিক সংঘর্ষ রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেই জায়গায় এই গ্রাম অন্য কথা বলে। এখানে না আছে কোনও রাজনৈতিক বিদ্বেষ, না আছে কোনও রাজনৈতিক সংঘর্ষ। তবে রাজনৈতিক দলগুলি যথেষ্ট সক্রিয়, প্রচারও চলছে। কিন্তু সেসব হেসেখেলে, আড্ডার মেজাজেই হচ্ছে।

আলিপুরদুয়ার থেকে সোজা হাসিমারা গিয়ে সেখান থেকে চিলাপাতা জঙ্গলের ভিতর দিয়ে যাওয়া রাজ্য সড়ক ধরে এগোলেই পৌঁছে যাওয়া যায় এই গ্রামে। আবার আলিপুরদুয়ার শহর থেকে ৩১ডি জাতীয় সড়ক ধরে সোনাপুর গিয়ে সেখান থেকেও সোনাপুর-জয়গাঁ রাজ্য সড়ক ধরে ওই গ্রামে যাওয়া যাবে। গ্রামের বেশিরভাগই আদিবাসী এবং রাভা জনজাতির মানুষ। সকালে মিলেমিশে একসঙ্গেই কাটান বলে জানান স্থানীয়রা।

- Advertisement -

রাস্তার ধারেই রয়েছে বন দপ্তরের চেকপোস্ট। সেখান থেকে দুই দিকে দুটি পেভার্স ব্লকের রাস্তা দিয়ে সোজা পথ চলে যায় গ্রামের ভিতরে। মেন্দাবাড়ি গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ১১/২০১ নম্বর বুথের প্রায় ২,০০০ বাসিন্দা এই গ্রামে বসবাস করেন। সেখানে ৬২৪ জন মহিলা ভোটার এবং ৫৬৫ জন পুরুষ-ভোটার মিলিয়ে মোট প্রায় ১,২০০ ভোটার রয়েছেন। গ্রামের বাসিন্দাদের বেশিরভাগই কৃষিকাজের সঙ্গে যুক্ত। অনেকে বাইরে শ্রমিকের কাজ করেন।

গ্রামবাসীরা জানালেন, এই গ্রামে কোনওদিন রাজনৈতিক হিংসা হয়নি। স্থানীয় অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে তা নিয়ে সংঘর্ষ হয়নি। সব দলই প্রচার করে নিজেদের মতো। তবে এই জায়গায় প্রচার মানেই বিভিন্ন দলের লোকজন একসঙ্গে বসে নিজেদের মতামত আদানপ্রদান করবেন। ২০১৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে যখন বিভিন্ন জায়গায় হিংসা বা রাজনৈতিক মিথ্যা কেসে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, তার আঁচ লাগেনি এই গ্রামে।

অথচ প্রত্যন্ত এলাকার গ্রামগুলির মতো এখানেও অনেক সমস্যা। এই জায়গায় রয়েছে শুধু একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। উচ্চ বিদ্যালয়ের জন্য দশ কিলোমিটার দূরে চিলাপাতা হাইস্কুল, না হলে মালঙ্গি হাইস্কুলে যেতে হয়। গ্রামের বড় সমস্যা মোবাইল টাওয়ার। লকডাউনে সব স্কুল বন্ধ থাকায়  অনলাইন ক্লাস শুরু হয়েছে। তবে গ্রামের বাচ্চারা সেই পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত। অনলাইন পরীক্ষা দিতে হলেও তাদের অনেক দূরে গিয়ে দিতে হয়। এছাড়া গ্রামের কিছু সেতু ও কালভার্ট ভাঙা। সেগুলো সংস্কার না হওয়ায় যাতায়াতেও সমস্যা হয়।

এলাকায় আগে পাটের উৎপাদন ভালো হত। কিন্তু জলসেচের সঠিক ব্যবস্থা না থাকায় তা ক্রমশ সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর পাশাপাশি আবার তোর্ষা নদীর ভাঙনে জমির অনেক ক্ষতি হয়েছে। তবে এত সমস্যার মধ্যেও গ্রামের মানুষের মধ্যে একতা রয়েছে। আর তাই এই একতা ভেঙে এখানে ঢুকতে পারেনি রাজনৈতিক বিদ্বেষ।

স্থানীয় শ্যামল রাভা বলেন, টিভিতে এবং বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের অনেক খবর শোনা যায়। তবে সেটা কেমন, গ্রামবাসীরা এই তিক্ত স্বাদ আজও পায়নি এবং পেতেও চায় না। সকলেই মিলেমিশে একটা পরিবারের মতো করে থাকে। কোনও সমস্যা হলে আলোচনার মধ্যেই মিটে যায়। গ্রামের আরেক যুবক ছোট্টু ওরাওঁ বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ সবাই একসঙ্গে মিলেই থাকে। রাজনৈতিক কোন্দল আমাদের কাছে গল্পের মতো। ওটা এখানে না আসাই ভালো। এই গ্রামের এক গৃহবধূ মিলি রাভা বলেন, আমাদের গ্রামের অনেক সমস্যা রয়েছে। তবে সেসবের ঊর্ধ্বে একতা এবং ভ্রাতৃত্ব রয়েছে।

স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যা নীলিমা রাভা গ্রামবাসীদের সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, আমরা সবাই একসঙ্গে থাকি। কিছু সমস্যা থাকলেও অনেক কাজ করা হয়েছে। গ্রামের ভিতর দিয়ে পেভার্স ব্লকের রাস্তা হয়েছে। অনেক সিসি রাস্তাও হয়েছে। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় সোলার লাইট বসানো হয়েছে। আগামীতেও অনেক কাজ হবে। স্থানীয় বিজেপি নেতা গবেন রাভা বলেন, বিভিন্ন জায়গায় রাজনৈতিক হিংসা দেখা গেলেও আমাদের এই জায়গায় সেটা নেই। শাসকদলের সদস্যরা আমাদের সঙ্গে মিলেমিশেই কাজ করেন।