হরিরামপুর : নিজের হাতে তৈরি শোলার কাজ দেখিয়ে মুম্বই মাতালেন দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার হরিরামপুর ব্লকের শোলাশিল্পী মধুমঙ্গল মালাকার। হরিরামপুর ব্লকের একেবারে শেষ গ্রাম মুশকিপুরে মধুমঙ্গল মালাকারের বাড়ি। বাবা প্রয়াত তরণিকান্ত মালাকারও ছিলেন শোলাশিল্পী। বাবার হাত ধরেই শোলা শিল্পে প্রবেশ মধুমঙ্গলের। ২১ বছর বয়সে কলকাতায় জাহাঙ্গির আর্ট গ্যালারির মেলা দিয়ে তাঁর পথচলা শুরু। এরপর দিল্লি, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ হয়ে ১৯৯৬ সালে হিউস্টনে অনুষ্ঠিত ষোড়শ বঙ্গ উৎসবে তিনি শোলাশিল্পী হিসাবে অংশ নেন। গত কয়েক বছরে তিনি নিজের তৈরি শোলার কাজ নিয়ে সানফ্রান্সিসকো, মাদ্রিদ, বার্সিলোনা, ফিলাডেলফিয়ার মতো শহরে যান। এবার মুম্বই শহর মাতালেন তিনি।

শিল্পী জানান, সম্প্রতি মুম্বই ফিল্ম ডিভিশন সারা দেশের গয়না ও শোলা শিল্প নিয়ে বছরব্যাপী কর্মশালা, প্রদর্শনী ও বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করে। উদ্দেশ্য, সিনেমা জগতে নতুনত্বের খোঁজ ও ব্যবহার। সেই উদ্যোগে রাজ্যের মধ্যে তিনিই একমাত্র শোলাশিল্পী হিসাবে ডাক পান। মধুবাবু বলেন, এমন উদ্যোগ শুধু যে বিক্রি বাড়ায় তাই নয়, দেশের বহু শিল্পের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ ও বিক্রির বাজারও তৈরি করে দেয়। শোলা দিয়ে হাত, নাক ও কানের গয়না, ঘর সাজানোর বহু উপকরণ, মুকুট, মালা থেকে শুরু করে চুলের খোঁপার ফুলও যে তৈরি হতে পারে, এই ধারণাই বহু মানুষের ছিল না। শোলার তৈরি গয়না এত হালকা ও সুন্দর য়া সহজেই সবাইকে আকর্ষণ করে। মুম্বই ফিল্ম ডিভিশনের বহু মানুষ ওই মেলায় শোলার কাজ দেখে আমার প্রশংসাও করেছেন। তবে সারা বছর কাজ থাকে না। যখন কাজ থাকে না তখন মুশকিপুরের বাড়িতে ফিরে চায়ের দোকান খুলে বসি। চায়ের দোকানেই অসময়ে বসে শোলার কাজে ডুব দিই।

- Advertisement -

তাজিয়া, পিরের ঘোড়া, আদিবাসী ঘোড়া, অথাই-পাথাই (রাজবংশী রীতিতে ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত), মনসার পট, দেবদেবীদের বুকবন্ধ, জাতি, বাসন্তী থেকে জন্ম ও মৃত্যু পর্যন্ত শোলার প্রয়োজন হয়। সেই শোলার কাজকে দুই শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। মধুমঙ্গল মালাকার ঐতিহ্যবাহী শোলাশিল্পী। প্রথাগত কাজ যে একেবারে হয় না, তা নয়। তবে মধুমঙ্গল মালাকার সৃষ্টিশীল কাজ করতেই বেশি সাবলীল। এতবার বিদেশ ভ্রমণের পরে শিল্পীকে কেন অবসরে চায়ের দোকানে এসে বসতে হয়? সেপ্রসঙ্গে মধুমঙ্গলবাবু জানিয়েছেন, বিদেশ গেলে বড়োলোক হয় শুনেছি। তবে আমি হতে পারিনি। তাই সংসার চালাতে চায়ের দোকান করতেই হয়। পাঁচ প্রজন্মের শোলার কাজ পৃথিবীর মানুষকে দেখানোর ইচ্ছে ছিল। সেই কারণেই হয়তো বড়োলোক হওয়া আটকে গিয়েছে। বেসরকারি বহু জায়গায় সম্মানিত হলেও রাজ্য সরকারের কোনো সম্মান এখনও জোটেনি। তবে এনিয়ে আমার কোনো আক্ষেপ নেই।

তিনি বলেন, আমি চাই, রাজ্যে হস্তশিল্পের আরও বড়ো বাজার গড়ে উঠুক। সেই বাজার গড়ে উঠুক দেশের বড়ো শহরগুলিতেও। তার জন্য মুম্বই ফিল্ম ডিভিশনের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। এই শোলা শিল্পকে ফিল্ম নির্মাতারা কাজে লাগিয়ে যদি আরও সুন্দর করতে পারেন তবে একটা নতুন পথের সূচনা হবে। তবে তখন আবার মুশকিপুর গ্রামে ফিরে এসে চায়ের দোকানে বসতে হবে কিনা তা অবশ্য সময়ই বলবে।