কাজ নেই, অর্ধাহার রাভাবস্তির ঘরে ঘরে

207

আলিপুরদুয়ার ও ধূপগুড়ি : পেট চালানোর অন্যতম ভরসা দিনমজুরি। বন দপ্তর থেকে কাজের বরাত পেয়ে বা স্থানীয় গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে ১০০ দিনের কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চলে।  মাঝে মাঝে জঙ্গলে কাঠ কুড়িয়ে নদীতে মাছ ধরে সামান্য কিছু আয় হয় বটে,  কিন্তু করোনো পরিস্থিতি যেন অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছে ডুয়ার্সের রাভা বস্তির বাসিন্দাদের ওপর। লকডাউনে কাজ নেই। উপার্জনের সব রাস্তা বন্ধ। জ্বালানির কাঠ কুড়িয়ে বা মাছ ধরার জাল বানিয়ে বিক্রি হচ্ছে না। র‌্যাশন থেকে যে পরিমাণ চাল মেলে, তাতে উনুনে হাঁড়ি চাপে ঠিকই, কিন্তু পেট ভরে না। এমনই দুর্ভাগ্যে, কোথাও যে দিনমজুরি করে দুটো পয়সা  রোজগার করবেন, সে উপায়ও নেই। লকডাউনে কেই বা কাজ দেবে। ফলত একপ্রকার না খেয়ে দিন কাটছে বস্তিবাসীদের।

আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকে শালকুমারহাটে রাভা বনবস্তির বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভোটের আগে নেতারা এলাকায় এসে খোঁজখবর নিতেন। ভোটপর্ব মিটে যাওয়ার পর তাঁদের টিকিরও দেখা মেলে না এলাকায়। এদিকে, লকডাউনের জেরে বন দপ্তর বা গ্রাম পঞ্চায়েত কোথাও কাজের বরাত মিলছে না। একশো দিনের কাজও এখন বন্ধ। এই অবস্থায় সংসার কীভাবে চলবে, সেই চিন্তাই বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে বাসিন্দাদের মধ্যে।

- Advertisement -

রোজগার হারিয়ে বসে আছেন জলদাপাড়া সাউথ রেঞ্জে বিছনবাড়ি ফরেস্টের রাভা বনবস্তিবাসীরাও। প্রায় ৮৪টি রাভা পরিবারের বসবাস এই বনবস্তিতে। গতবার থেকে বাসিন্দাদের অর্থকষ্ট যেন কিছুতেই পিছু ছাড়তে চাইছে না। গত বছর লকডাউনের সময় বাসিন্দাদের অনেকে কাজ হারিয়েছিলেন। চলতি বছর লকডাউন উঠে গেলে রাভারা ভেবেছিলেন, এবার বুঝি কষ্টের দিন ঘুচবে। কিন্তু, বিধি বাম। সংক্রমণের বাড়াবাড়ি শুরু হলে ফের নতুন করে লকডাউন পরিস্থতি শুরু হয়ে যাওয়ায় ফের উপার্জনহীনতায় কাটাতে হচ্ছে এলাকাবাসীদের। বস্তির অনেকে ভিনরাজ্যে কাজ করেন। লকডাউনে যান চলাচল বন্ধ থাকায় তাঁরাও বাড়ি ফিরে আসতে পারছেন না। কাজ না পেয়ে বস্তির কর্মঠ পুরুষরা এখন লুডো খেলে, গাছতলায় আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছেন। এলাকার বাসিন্দা মন্টু রাভা বলেন, এই দুর্দিনে পাশে দাঁড়ানোর কেউ নেই। কাজ পাচ্ছি না কোথাও। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে যদি ১০০ দিনের কাজও জোটে, তাও তো কিছু সুবিধা হয়।

রাভাদের এই সমস্যার কথা মানেন আলিপুরদুয়ারের বিধায়ক সুমন কাঞ্জিলাল। তিনি বলেন, ১০০ দিনের কাজ দেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রশাসনের দেখার দায়িত্ব। আর স্থানীয় প্রশাসন তৃণমূলের নেতারা পরিচালনা করেন। আমি রাভাবস্তিতে যাব। ব্যক্তিগতভাবে যেটুকু করতে পারি, করব।  শালকুমারহাট-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান উত্তম কার্জি অবশ্য বলেন, ভোটের পর ১০০ দিনের একটি প্রকল্প রাভাবস্তিতে শুরু হয়েছিল। ৪০ জন জব কার্ডধারীকে ওই কাজে নেওয়া হয়। কাজ শেষ না হওয়ায় মজুরি এখনও মেলেনি। বস্তির সবাইকে এখন কাজে নেওয়াও সম্ভব হচ্ছে না। আমি বস্তির বাসিন্দাদের খোঁজ রাখছি। পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে ১০০ দিনের কাজ ফের শুরু হবে। কিন্তু রাভাদের প্রশ্ন, ততদিন কি তবে পেটে হাত দিয়ে কাটাতে হবে?

একই সমস্যা ধূপগুড়ি ব্লকে ঝাড়আলতা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের রাভাবস্তির বাসিন্দাদেরও। কাজ হারিয়ে গ্রামের মহিলা-পুরুষরা এখন চালুনি এবং মাছ ধরার সরঞ্জাম তৈরি করছেন। তবে লাভের লাভ কিছুই হচ্ছে না। সামগ্রী তৈরি করলেও সেগুলি কেনার কেউ নেই। স্থানীয় বাসিন্দা রবি রাভার কথায়, নতুন কোনও কাজের বরাত নেই। বাধ্য হয়ে এইসব তৈরি করছি। কিন্তু বিক্রি প্রায় নেই বললেই চলে। বন দপ্তর সূত্রে খবর, কাজের নতুন বরাত চেয়ে উপরমহলে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। মোরাঘাটের রেঞ্জার রাজকুমার পাল বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে কাজের বরাদ্দ কম আসছে। তবে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ আসলেই কাজ শুরু হবে।