আশা পূরণ হয় না, তবুও ভোট দেয় বনবস্তি

86

নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায়, কুমারগ্রাম : প্রত্যাশা পূরণে টানা কয়েক দশক ধরে বিধানসভা ভোট দিয়ে আসছেন দুর্গম সংকোশ বনবস্তির বাসিন্দারা। অভিযোগ, বছরের পর বছর উন্নয়নের একাধিক দাবি অধরা। তবু নির্বাচন এলেই বুকভরা আশা নিয়ে প্রত্যাশা পূরণের দিকে তাকিয়ে থাকেন তাঁরা। সমস্যা সমাধানে এবার নিশ্চয়ই নতুন সরকার বনবস্তির দিকে নজর দেবে, এই আশা নিয়ে ভোটকেন্দ্রের পথে পা বাড়ান সংকোশ বনবস্তির বাসিন্দারা। এবারও তার অন্যথা হচ্ছে না।

নদী, পাহাড়, জঙ্গল ঘেরা ইন্দো-ভুটান সীমান্তের প্রত্যন্ত সংকোশ বনবস্তির ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে প্রশাসনের খাতায় দুর্গম এলাকা। মেরেকেটে দেড়শো পরিবারের ১,২০০ লোকের বসবাস। ভোটার সংখ্যা সাতশোর কাছাকাছি। রাস্তাঘাট নেই বললেই চলে। বন্য জীবজন্তুর আক্রমণের ভয়কে সঙ্গী করে বছরভর শ্বাপদসংকুল পথে যাতায়াত করতে হয়।  যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা, চিকিৎসা থেকে শুরু করে সবেতেই নানা সমস্যায় জর্জরিত বনবস্তির অসহায় মানুষজন। তাই বিধানসভা ভোটের ঢংকা বাজলেই প্রত্যাশা পূরণে উৎসাহী হয়ে ভোট দেন তাঁরা। বনবস্তির ভোটাররা মনে করেন, এবার হয়তো নতুন সরকার বনবস্তির সার্বিক উন্নয়নে নজর দেবে। অসহায় মানুষগুলোর কথা ভাববে। তাই নানাবিধ সমস্যার স্থাযী সমাধানের আশায় এবারও সংকোশ বনবস্তি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভোটগ্রহণ কেন্দ্রে প্রত্যাশা পূরণের ভোট দেবেন বনবস্তিবাসী।

- Advertisement -

বনবস্তিবাসী এন ছেত্রী বলেন, বর্তমানে টেকনলজির যুগে সরকারি উদাসীনতার কারণে আমরা পিছিয়ে আছি। হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল সেট থাকলেও টাওয়ারের অভাবে সেটা ব্যবহার করতে পারি না। বনবস্তিতে বিএসএনএলের টেলিফোন পরিষেবাও নেই। ফলে দৈনন্দিন কাজকর্মে খুব সমস্যা হয়। বিপদে-আপদে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে হলে কয়েক কিলোমিটার দূরে যেতে হয়। তাতেও দূরদূরান্তে থাকা আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে সময়মতো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়ে উঠে না। এ ব্যাপারে এলাকার বিধায়ক থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসনের শীর্ষকর্তাদের কাছে দরবার করেও লাভ হয়নি কিছুই।

স্থানীয় বাসিন্দা রাজু ছেত্রীর কথায়, টানা কয়েক দশক ধরে সংকোশ বনবস্তিতে অনুন্নয়নই এখানে বিধানসভা ভোটের প্রধান ইস্যু। রাস্তাঘাট নেই। বনবস্তি যাতায়াতে হাতিনালা এবং বড় নালার উপর পাকা সেতু নির্মাণের দাবি প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে জানানো হলেও সমস্যা মেটাতে এগিয়ে আসেনি কেউই। ভরা বর্ষায় পাহাড়ি নালাগুলি ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সেতুর অভাবে জলে টইটম্বুর নালা পেরিয়ে অ্যাম্বুল্যান্স পর্যন্ত ঢুকতে পারে না। বনবস্তি ঢোকার মুখে নড়বড়ে কাঠের সরু সেতুর জায়গায় পাকা সেতু নির্মাণের দাবিতে বহু আবেদন-নিবেদন করেও কাজ হয়নি কিছুই।

দীপক থাপা ছেত্রী নামে আরেক বলেন, খাবারের লোভে বছরভর হাতির হানা লেগে থাকে। প্রত্যেক বছর ঘরবাড়ি ভেঙে খেতের ফসল নষ্ট করে দেওয়ায় প্রচুর লোকসান হয়। হাতির হামলা রুখতে বনবস্তির চারপাশে সোলার ফেন্সিং দেওয়ার দাবি বন দপ্তরে বহুবার জানানো হয়েছে। কিন্তু ওই দাবি আজও পূরণ হয়নি। আংশিক কাজ হলেও তিন কিলোমিটারের মতো অংশ অসুরক্ষিত থেকে গিয়েছে। একই কথা বলেন  কৌশিলা ছেত্রী, আনসু ছেত্রীরাও।

সংকোশ বনবস্তির একজন বাসিন্দাদের অভিযোগ, যথাযথ নজরদারির অভাবে বনজঙ্গল কেটে সাফ করে দিচ্ছে কাঠ মাফিয়ারা। মাঝেমধ্যে সংকোশ নদী পেরিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে অসমের দুষ্কৃতীরাও ঢুকে পড়ছে বনবস্তি এলাকায়। বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের সংরক্ষিত জঙ্গলে বন্য জীবজন্তু শিকার সহ নানা ধরনের অপরাধমূলক পাচারের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব অপরাধমূলক কাজকর্ম প্রতিরোধে সরকার চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। কিন্তু সরকারের তরফে তেমন সদিচ্ছা দেখছি না আমরা। পরিবার পরিজন নিয়ে কার্যত ভয়ে ভয়ে নানা দুশ্চিন্তায় জীবনয়াপন করতে হয়। নিজের বাড়িতেই নিজেকে অসুরক্ষিত মনে হয়।