শমিদীপ দত্ত, শিলিগুড়ি : শিলিগুড়ি রেগুলেটেড মার্কেট মানেই আড়তদার, পাইকারি ব্যবসায়ীদের মধ্যে লাখো টাকার ব্যবসা। সারাদিনে ট্রাক ভরতি মাল লোডিং-আনলোডিংয়ের মাঝেই মার্কেট চত্বরে দীর্ঘদিন ধরে আবর্জনার সমস্যা রয়েছে। আড়তদারদের ফেলে দেওয়া বাতিল মালের সেই আবর্জনাই কোথাও যেন জীবনযুদ্ধে বেঁচে থাকার মাধ্যম হযে উঠেছে রীতা, মন্টুদের কাছে। আবর্জনা হিসেবে পড়ে থাকা আলু, পেঁয়াজ সহ বিভিন্ন ধরনের শাকসবজির স্তূপ থেকে চলনসই অংশটুকু বের করার মাধ্যমেই  কিছু বাড়ির উনুন জ্বলছে। কেউ আদা সংগ্রহ করে স্বল্পমূল্যে সেগুলি বিক্রি করেই কোনোভাবে জীবন কাটাচ্ছেন। অন্যদের কাছে মার্কেটের এই আবর্জনা দুর্গন্ধের হলেও ওই মানুষজনের কথায়, এই আবর্জনাই আমাদের বেঁচে থাকার উৎস।

সূর্যের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই রেগুলেটেড মার্কেটে শুরু হয় পাইকারি ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। ফ্রুটস অ্যান্ড ভেজিটেবল কমপ্লেক্স, পটেটো কমপ্লেক্স থেকে শুরু করে জিঞ্জার কমপ্লেক্সের আড়তগুলিতে ১০ চাকার, ১৪ চাকার ট্রাক থেকে মালপত্র ঢোকানোর পাশাপাশি শুরু হয় বিক্রিবাটা। এই লোডিং-আনলোডিংয়ের সময় শাকসবজির কিছু অংশ যেমন মাটিতে পড়ে যায়, ঠিক তেমনই আড়তদাররা বাতিল মালগুলো রাস্তায় ফেলে দেন। মার্কেট চত্বরে ডাস্টবিনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় রাস্তার উপরেই যত্রতত্র পড়ে থাকা আবর্জনার এই স্তূপের সামনেই ব্যাগ হাতে কিছু মানুষ হাজির হয়ে যান। কেউ একা, কেউ সপরিবারে।

- Advertisement -

আবর্জনা থেকে বেরোনো দুর্গন্ধের জেরে পাশ দিয়ে সাধারণ মানুষ যখন নাকে কাপড় চাপা দিয়ে যান, তখন সেই আবর্জনার মধ্যেই একমনে মণিমুক্তোর মতো সবজি খুঁজতে দেখা যায় রীতাদের। চম্পাসারির এই বাসিন্দার এক ছেলে থাকলেও বর্তমানে তিনি একা থাকেন। বয়স হয়ে যাওয়ায় কর্মক্ষমতা হারিয়েছেন। সেকারণেই রীতাদেবী রাস্তার একপাশে পড়ে থাকা বাতিল ওই আলুর স্তূপের আবর্জনা থেকে চলনসই আলু খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন। পঁচাত্তর বছর বয়সি ওই মহিলার কথায়, দশবছর আগে ছেলে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে। কাজ করে অর্থ উপার্জনের ক্ষমতা নেই। তাই এই মার্কেটে এসে আবর্জনা হিসেবে পড়ে থাকা আলু, পেঁয়াজ, আদার স্তূপ থেকে খাবারের জন্য উপযোগী অংশটুকু বের করার চেষ্টা করি। যতটুকু বের করতে পারি তা বাড়িতে রান্না করে পেট ভরাই।

রীতাদেবীর মতোই জিঞ্জার কমপ্লেক্সে মণিমুক্তো খুঁজতে দেখা গেল মন্টু ঘোষকে। তাঁর কথায়, স্তূপের মধ্যে থেকে ব্যবহারযোগ্য হিসেবে পাওয়া আদা সংগ্রহ করে ৫ টাকা মুঠো হিসেবে বাজারে বিক্রি করি। এভাবেই ২০ বছর ধরে কোনোভাবে জীবন কাটিয়ে চলেছেন বলে তিনি জানিয়েছেন। শুধু রীতাদেবী কিংবা মন্টুবাবুই নয়, সপরিবারে আদার স্তূপের মধ্যেই পেটের ভাত জোগানোর মাধ্যম খুঁজতে দেখা গেল অজিত সাহানিকে। দুর্গন্ধের বিষয়ে প্রশ্ন করতেই তিনি বলে উঠলেন, কী করব বাবু। দুর্গন্ধ আমাদেরও লাগে। কিন্তু এতকিছু ভাবলে যে পেট চালানো যাবে না। অন্যদের কাছে দুর্গন্ধের এই স্তূপই আমাদের পেটের ভাত দেয়। এই স্তূপই আমাদের কাছে ভগবানের আশীর্বাদ।