মানসিকভাবে সুস্থ, তবু হাসপাতালই বাড়িঘর ওঁদের

সুবীর মহন্ত, বালুরঘাট : প্রায় একবছর ধরে সুস্থ হয়েও বাড়ি ফিরতে পারছেন না বালুরঘাট হাসপাতালের মানসিক বিভাগের আটজন আবাসিক। প্রশাসনিক জটিলতায় এবং পরিবারের অবহেলার দরুণ তাঁদের বাড়ি ফেরানো যায়নি। ফলে সুস্থ হয়ে প্রকৃত মানসিক রোগীদের মধ্যেই বন্দি থেকে দিন কাটাতে হচ্ছে ওই আবাসিকদের।

দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা সদর বালুরঘাট হাসপাতালের ক্যাম্পাসেই রয়েছে মানসিক বিভাগ। সুপার অফিসের সামনে থাকা ওই মানসিক বিভাগে বর্তমানে ১২ জন আবাসিক রয়েছেন। এদের মধ্যে মহিলা নয়জন এবং পুরুষ রয়েছেন ৩ জন। এই রোগীদের অধিকাংশই প্রায় ৪ থেকে ৫ বছর ধরে, কেউ বা তারও বেশি সময় ধরে রয়েছেন। এই রোগীদের অধিকাংশই বর্তমানে সুস্থ। কিন্তু পরিবারের তরফে কোনো যোগাযোগই রাখা হয় না। ফলে সুস্থ হয়ে উঠলেও এদের কিন্তু বাড়িতে বা সমাজে ফেরানো যাচ্ছে না। এই রোগীদের বেশিরভাগই দাবিহীন। বাধ্য হয়ে তাঁদের মানসিক হাসপাতালে রেখে দিতে বাধ্য হচ্ছেন কর্তৃপক্ষ। প্রকৃত মানসিক রোগীদের মাঝেই সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিকদের থাকতে হচ্ছে।

- Advertisement -

এই জীবন নরকের চেয়ে কষ্টকর বলে দাবি এক আবাসিকের। বছরখানেক আগে সুস্থ হয়ে ওঠা রোগীদের, বাড়ি ফেরার আকুতি ভরা জিজ্ঞাসার উত্তর দেবার ভয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অনেকেই মানসিক বিভাগের সামনে দিয়ে যাওয়া-আসা করাও ছেড়ে দিয়েছেন। মাস ছয়েক আগে জেলা হাসপাতালের রোগীকল্যাণ সমিতির বৈঠকে সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিকদের বাড়ি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। এমন ৮ জন রোগীকে চিহ্নিত করে তাঁদের সুস্থ হয়ে ওঠার রিপোর্ট সহ প্রশাসনিক স্তরে তাঁদের বাড়ি ফেরানোর জন্য তদ্বির শুরু হয়েছিল। জেলাশাসক ও প্রশাসনের অন্যান্য কর্তাদের সামনে ওই সভায় সুস্থ হয়ে ওঠা মানসিক রোগীদের বাড়ি ফেরানোর বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। দাযিত্ব দেওয়া হয়েছিল মহকুমাশাসককে। তিনি ওই রোগীদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে সমস্ত ব্যবস্থা করে রোগীদের বাড়ি ফেরাবেন বলেও জানিয়েছিলেন। সেই মোতাবেক বালুরঘাট হাসপাতালের মানসিক বিভাগের চিকিৎসক ড. ঋতব্রত ব্যানার্জি প্রত্যেক রোগীর পরীক্ষানিরীক্ষা এবং দেখভালের পর তিনি তাঁদের সুস্থতার রিপোর্ট তৈরি করে জেলা স্বাস্থ্যদপ্তরে পাঠান। ওই দপ্তর সেগুলি মহকুমাশাসকের দপ্তরে পাঠিয়ে দিয়েছিল। এরপরে মহকুমাশাসকের দপ্তর থেকে ওই রোগীদের বাড়ি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রক্রিয়া থমকে থাকায় ৮ জন সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিককে মানসিক হাসপাতালেই থেকে যেতে হয়েছে।

বছর কয়েক আগে গঙ্গারামপুরের অঙ্গনওয়াড়ি কর্মী ইতি শীলকে তাঁর পরিবারের লোকেরা বালুরঘাট হাসপাতালের মানসিক বিভাগে রেখে যান। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি সুস্থ হয়ে থাকলেও পরিবার তাঁকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে রাজি হননি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে বাড়িতে রেখে আসা হলেও কিছুদিনের মধ্যেই ফের বাড়ির লোকেরা তাঁকে হাসপাতালে রেখে যান। এরপর থেকে ইতি শীল হাসপাতালেই বন্দি রয়ে গিয়েছেন। ইতি শীলের মতোই আরও ৭ জন নারী ও পুরুষ সুস্থ হলেও পরিবারের বাধায় বাড়ি ফিরতে পারেননি।

বালুরঘাটের কবি মৃণাল চক্রবর্তী বলেন, পাগলামি তো সকলের ভেতরেই থাকে। কিন্তু এইসব রোগীদের অবহেলা করা একদম ঠিক নয়। বিশেষ করে তারা যখন সুস্থ হয়ে উঠেছেন, তখন তাঁদের ভালোবাসা অত্যন্ত জরুরী। আর তাঁদের পরিবারই যদি আপন করে না নিতে পারে, তার চেয়ে বেদনাদায়ক আর কিছু হতে পারে না। তবে প্রশাসন বাড়ি ফেরানোর যে উদ্যোগ নিয়েছিল, তাকে সাধুবাদ জানাই। গল্পকার শুভ্রদীপ চৌধুরি বলেন, পরিবারই যদি তাদের আপন করে না নেয়, ভালোবাসা না দেয়, তবে তাঁদের কারা ভালবাসবে? এমন দুঃখজনক ঘটনা মেনে নেওয়া যায় না। জেলা মুখ্য স্বাস্থ্য আধিকারিক ড. সুকুমার দে বলেন, মাস ছয়েক আগে রোগীকল্যাণ সমিতির সভা থেকে সুস্থ হয়ে ওঠা আবাসিকদের বাড়ি ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে এখনো তাঁদের বাড়ি ফেরানো যায়নি। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁদের মানসিক হাসপাতালে রেখে দিতে হয়েছে।