টোটোপাড়ার স্কুলের মাধ্যমিকের ফল দিন-দিন খারাপ হচ্ছে, হতাশ পড়ুয়ারা

202

নীহাররঞ্জন ঘোষ  মাদারিহাট : যতদিন যাচ্ছে ধনপতি টোটো মেমোরিয়াল হাইস্কুলের মাধ্যমিকের ফল খারাপ হচ্ছে। শিক্ষিত হয়ে প্রাক্তন ছাত্র-ছাত্রীরা চাকরি পাচ্ছে না। তাই হতাশায় ছাত্র-ছাত্রীরা পড়াশোনা ছেড়ে ভুটানে চলে যাচ্ছে দিন হাজিরার কাজ করতে। এই নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন টোটোদের একাংশ। এবার ওই স্কুল থেকে মাধ্যমিক বসেছিল ৪৫ জন। প্রধান শিক্ষিকা মিসা ঘোষাল জানান, পাশ করেছে ১৭ জন। টোটো মেয়েদের মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়েছে প্রতিমা টোটো (২২৩)। ছেলেদের মধ্যে সর্বোচ্চ পেয়েছে গৌরম টোটো (২০৬)। যদিও প্রধান শিক্ষিকার দাবি-ফল খারাপ হয়নি। ফল খারাপ হওয়ার জন্য তার যুক্তি, পাঁচজন শিক্ষক নেই। ইংরেজি ও বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই। এবার ৬৫ শতাংশ টোটো ছাত্র-ছাত্রী পাশ করেছে। পাশের হার একসময় ৮০ শতাংশে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন।

এই ব্যাপারে ব্যাংক ম্যানেজার ভক্ত টোটো জানান, প্রধান শিক্ষিকার যুক্তি মানতে পারছি না। তিনি জানান, যদি শিক্ষকের অভাবে ফল খারাপ হয় তবে যে বিষয়ে শিক্ষক রয়েছেন সেই বিষয়গুলির ফল কেন খারাপ হল। তিনি জানান, এবার যে কয়জন পাশ করেছে প্রায় সকলেই প্রত্যেক বিষয়ে ২৫ নম্বর করে পেয়েছে। এরমধ্যে লিখিত পরীক্ষায় ৯০ এর মধ্যে ১৫ নম্বর এবং মৌখিক ১০ করে পেয়েছে। তিনি জানান, এইসব যুক্তি বা অজুহাত না দিয়ে যাঁরা নিজেদের দায়িত্ব পালন করছেন না তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

- Advertisement -

টোটোপাড়ায় শিক্ষার হার যতদিন যাচ্ছে তত নিম্নমুখী হচ্ছে। এর মূল কারণ পরিবারের আর্থিক অনটন। অপরদিকে, যাঁরা শিক্ষিত হয়ে চাকরি পাচ্ছেন না তাঁদের অবস্থা দেখে বাকিদের হতাশা গ্রাস করেছে। এমনটাই জানালেন টোটো কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বকুল টোটো। ব্যাপারটা মেনে নিয়েছেন তৃণমূল ছাত্র পরিষদের টোটোপাড়া বল্লালগুড়ি অঞ্চল সভাপতি সোনে টোটোও।

টোটোপাড়ায় এ পর্যন্ত গ্র‌্যাজুয়েট হয়েছেন ১১ জন। একজন পোস্ট গ্র‌্যাজুয়েট হয়েছেন। এঁদের মধ্যে ১৯৯৯ সালে প্রথম গ্র‌্যাজুয়েট হন সঞ্জীব টোটো। তিনি অনগ্রসরশ্রেণি কল্যাণ বিভাগের চাকরি করছেন। আর মেয়েদের প্রথম ২০১০ সালে গ্রাজুয়েট হয়েছেন রীতা টোটো। তিনিও সরকারি চাকরি করেন। তিনি টোটোপাড়ায় সমাজকর্মী পদে কর্মরত। আর এক গ্র‌্যাজুয়েট গেটে টোটো চুক্তিভিত্তিক সরকারি চাকরি করছেন। সম্প্রতি সুরজান টোটো গ্র‌্যাজুয়েট হয়ে রেল পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। হিসেব বলছে মোট ১২ জনের মধ্যে সরকারি চাকরি পেয়েছেন ৪ জন। বাকিদের বেশির ভাগ চাকরি না পেয়ে ভুটান সহ বিভিন্ন জায়গায় দিন হাজিরার কাজ করছেন। অনেকেই আবার নদীতে বালিপাথর তোলার কাজ করছেন। আর এই ঘটনার মারাত্মক প্রভাব পড়েছে টোটোদের মধ্যে।

সমাজকর্মী রীতা টোটো জানান, মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়ার পর প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা ছেড়ে দিচ্ছে। এরজন্য পরিবারের খারাপ আর্থিক অবস্থা অনেকটাই দায়ী সমীক্ষায় তা উঠে এসেছে। আবার উচ্চ শিক্ষার জন্য বাইরে থেকে পড়াশোনার খরচের চাপ সামলাতে পারছেন না প্রচুর অভিভাবক। টোটোদের মধ্যে ২০১৬ সালের লাইব্রেরি সায়েন্স নিয়ে প্রথম পোস্ট গ্র‌্যাজুয়ে হয়েছেন ধনঞ্জয় টোটো। আজও পাননি তিনি কোনো সরকারি চাকরি। বেকারত্বের যন্ত্রণা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি।

টোটো কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক বকুল টোটো জানান, তাদের প্রিমিটিভ ট্রাইব ঘোষণা করার জন্য বহুবার আবেদন নিবেদন করা হয়েছে। কিন্তু আজও করা হয়নি। অথচ পৃথিবীর আর কোথাও টোটো জনজাতি নেই। তিনি জানান, অন্যান্য তফসিলি উপজাতির প্রার্থীদের সঙ্গে তাঁরা বিভিন্ন চাকরির পরীক্ষায় প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠেন না। তাঁরা সরকারি চাকরিতে তাঁদের বিশেষ কোটা রাখার দাবি জানিয়ে আসছেন। কিন্তু তাঁদের দাবি আজও পূরণ হয়নি। আজ এর প্রভাব পড়ছে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক পড়ুয়াদের মধ্যে। তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নেতা সোনে টোটো জানান, শিক্ষকদের আরও দায়িত্ব নিতে হবে। যাঁরা রয়েছেন তাঁরা ঠিকমতো দায়িত্ব পালন করলে এই ফল হত না।  প্রধান শিক্ষিকা মিসা ঘোষাল জানান,  ২০০৯ সালে আমি এখানে এসেছি। ওইসময় টোটোদের পাশের হার প্রায় শূন্য ছিল। সেখান থেকে পাশের হার ৮০ শতাংশে এনেছিলাম। কিন্তু স্কুলে পাঁচজন শিক্ষক না থাকায় পড়াশোনায় প্রভাব পড়েছে।