সন্তানদের নিয়ে বিপাকে ক্যানসার আক্রান্ত পিঙ্কি

অনির্বাণ চক্রবর্তী, কালিয়াগঞ্জ : যে ক্যানসারের হানা স্বামীর জীবন কেড়ে নিয়েছে, সেই রোগকে হারিয়ে সংসার জীবনে কঠিন লড়াইয়ে মধ্য দিয়ে জীবনয়াপন করছেন বছর উনত্রিশের পিঙ্কি সাহা। দুটি ছোট ছোট সন্তানকে নিয়ে জীবনধারণের লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। এখনও তাঁর চিকিৎসার প্রযোজন। কিন্তু করোনায় কর্মহারা পিঙ্কিদেবী বসে রয়েছেন বাড়িতে।

২০০৯ সালে কালিয়াগঞ্জের চিড়াইলপাড়ার বাসিন্দা পিঙ্কির বিয়ে হয় কালিয়াগঞ্জের পূর্ব আখানগরের ট্রাক ড্রাইভার রঞ্জিত সাহার সঙ্গে। পিঙ্কিদেবীর বাপের বাড়িতে তাঁর মা বাড়ি বাড়ি রান্নার কাজ করে কোনওরকমে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলেন। দুই সন্তানের মা ২০১২ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হন। কলকাতার একটি বেসরকারি হসপিটালে ১৫ বার কেমোথেরাপি দেওয়ার পর তাঁর অবস্থা স্থিতিশীল হয়। কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস ২০১৬ সালে পিঙ্কিদেবীর স্বামীও ক্যানসারে আক্রান্ত হন। অভাবের সংসারে বাড়ির জমির একাংশ বিক্রি করে মুম্বাইয়ে স্বামীর চিকিৎসা শুরু করেন তিনি। কিন্তু চিকিৎসার পরেও ২০১৮ সালে রঞ্জিতবাবু তাঁর জীবনযুদ্ধে হেরে যান। স্বামীহারা ক্যানসার আক্রান্ত পিঙ্কি ছেলে ও মেয়ে নিয়ে নতুন এক নতুন লড়াই শুরু করেন। এখনও তাঁর চিকিৎসার প্রযোজন। কিন্তু করোনায় কর্মহারা পিঙ্কিদেবীর এখন বাড়িতে বসে। ছেলে ও মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ গড়ে তোলার অদম্য ইচ্ছা তাঁকে প্রতিনিয়ত শক্তি জুগিয়ে চলেছে। বাচ্চা দুটির ভবিষ্যতের কথা ভেবে নতুন করে বাঁচবার স্বপ্ন দেখছেন এই অপরাজেয় মা।

- Advertisement -

পিঙ্কি বলেন, আমি ছাড়া সন্তানদের দেখভালের আর কেউ নেই এই সংসারে। তাই আমাকে ক্যানসারের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হচ্ছে। সন্তানদের মানুষের মতো মানুষ করে তুলতে হবে, যে কোনও মূল্যে। স্বামী মারা যাওয়ার পর পাশেই একটি দোকানে বস্তা সেলাইয়ে কাজ করা শুরু করি। কিন্তু মারণরোগকে সঙ্গে নিয়ে বেশিদিন বস্তা সেলাইয়ে কাজ করতে পারিনি। প্রতিদিন বস্তার ধুলোয় আরও বেশি করে শরীর খারাপ হচ্ছিল। এরপর চিড়াইলপাড়ার এক বেসরকারি নার্সারি স্কুলের গাড়ির আন্টি হিসেবে কাজে যোগ দেই। বিধবা ভাতা, র্যাশন এবং বেতন দিয়ে যেটুকু আয় হয়, তা দিয়ে ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে কোনওরকমভাবে সংসার চালাতে শুরু করেছিলাম। ছেলে রহিত পঞ্চম শ্রেণি এবং মেয়ে ঋতিকা দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশোনা করে। টিনের ছাউনি দেওয়া একটিমাত্র ঘরে এই তিনজনের সংসার। বর্তমানে করোনা আবহে স্কুলের কাজ এই মুহূর্তে বন্ধ। তাই বেতনও বন্ধ। এক দিকে মারণরোগের থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই, অন্যদিকে কর্মহীন জীবনে প্রতিদিনের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে আমি আজ দিশেহারা। তবুও আমায় এই সন্তানদের দিকে তাঁকিয়ে বেঁচে থাকতে হবে। না হলে ওরা এই বয়সে অনাথ হয়ে যাবে। এই মুহূর্তে আমার চিকিৎসার খুব প্রযোজন। কিন্তু কলকাতা যাওয়ার মতো পরিবেশ-পরিস্থিতি নেই।

এই সম্বন্ধে রহিত এবং ঋতিকার স্কুলের প্রধান শিক্ষক বিভুভূষণ সাহা বলেন, রহিতের মা ক্যানসারে আক্রান্ত। ওঁনার দুই সন্তানই পড়াশোনায় বেশ ভাল। একটি সুতোর মধ্যে পেন্ডুলামের মতো দুলছে ওদের ভবিষ্যৎ। রহিত ভালো নাটক করে। বাচ্চাদের নাট্য কর্মশালার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু জীবনের বাস্তব নাটকে রহিত অথবা ঋতিকা কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে তা বোঝার মতো বয়স দুইজনের মধ্যে একজনেরও হয়নি। ঈশ্বর যেন রক্ষা করেন এই পরিবারকে। পুজোর মধ্যে ওদের পাড়ার ছোটরা আনন্দ করলেও, ওরা যেন সেই নির্মল আনন্দ থেকে বহু ক্রোশ দূরে অবস্থান করছে।