পকলিনের দাপটে কর্মহীন, পেটের টানে ঘরবাড়ি ছেড়ে ভিনরাজ্যে

286

কুমারগ্রাম ও কামাখ্যাগুড়ি : নদীর বুকে অবৈধভাবে পকলিন নামিযে বালিপাথর তোলায় কর্মহীন হযে পড়েছেন কুমারগ্রাম ব্লকের বহু শ্রমজীবী মানুষ। সরকারি নিষেধাজ্ঞার তোযাক্কা না করে বিভিন্ন জায়গায় পকলিন ব্যবহার করে পাহাড়ি নদী রাযডাক এবং সংকোশের খাত অবাধে খুঁড়ে বালিপাথর তোলা হচ্ছে। ঘটনার জেরে কাজ হারিযে রুজিরুটির টানে পরিবার পরিজনদের ছেড়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিচ্ছেন নদী লাগোয়া বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা । এমনকি বন্ধ চা বাগানের শ্রমিকরাও এখন আর নদীতে আগের মতো কাজ পাচ্ছেন না। তাঁরাও ভিনরাজ্যে পা বাড়াচ্ছেন। বালিপাথর কারবারিদের এমন দৌরাত্ম্যে ওই কাজের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার মানুষ কাজ হারানোর পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। অবৈধ খননের ফলে বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তনও ঘটছে। পরিবেশপ্রেমীদের আশঙ্কা, একদিন বড়সড় প্রাকৃতিক বিপর্যয় ডেকে আনবে এই অবৈধ খনন। জেলা প্রশাসনের কর্তারা অবশ্য জানান, মাঝেমধ্যেই অভিযান চালিযে অবৈধভাবে বালিপাথর পরিবহণকারী ট্রাক, ডাম্পারগুলি আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেওযা হচ্ছে। জরিমানাও করা হচ্ছে। অবৈধ কারবারিদের ঠেকাতে আরও অভিযান চালানো হবে।

রাযডাক রিভার বেড লিজ হোল্ডার গোবিন্দ সরকার বলেন, ‘পূর্ব নারারথলি এলাকায স্থানীয শ্রমিকরাই বালিপাথর তোলেন। পকলিন বসানোর প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু আমরা রাজি হইনি।’ তাঁর আরও বক্তব্য, ‘সংকোশ সেতু লাগোযা এলাকা থেকে শুরু করে রাযডাকের বেলতলা, ছোট দলদলি, টিয়ামারিঘাট, ধনতলি টাপু সহ একাধিক জায়গায় অবৈধভাবে পকলিন বসিযে দীর্ঘদিন ধরেই বালিপাথর খনন করা হচ্ছিল।প্রশাসনিক অভিযানের ফলে নদীর বুকে পকলিনের ব্যবহার কিছুটা কমেছে। কিন্তু এখনও সংকোশ সেতু এবং রাযডাকের বেলতলা এলাকায পকলিন চলছে। মেশিন দিযে বালিপাথর তোলায় গাড়ি প্রতি খরচ কম হচ্ছে। ফলে লোক দিয়ে কাজ করালে প্রতিযোগিতায টিকে থাকাই মুশকিল হযে পড়েছে।’

- Advertisement -

এদিকে এই ব্যবস্থায় পেটের টানে পাকড়িগুড়ি, নাজিরান দেউতিখাতা, দক্ষিণ রামপুর, পূর্ব শালবাড়ি, চড়াইমহল, লালচাঁদপুর, ধনতলি টাপু সহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা বাইরে চলে যাচ্ছেন।খোযারডাঙ্গা লালচাঁদপুরের বাসিন্দা রঞ্জিত বরা বলেন, ‘পকলিনের দাপটে কর্মহীন হযে এলাকার মতিরাম কেরকেট্টা, পাপাই রায, রাজকুমার কেরকেট্টা, দীপক পৌরেল কেরলে চলে গিয়েছেন। কাজের সন্ধানে মিলন কাছুযা, দীপক রাই, ভুপেশ রাই সহ অনেকেই ভুটানের পাশাখা গিয়েছেন। আরও অনেকেই স্ত্রী, ছেলেমেয়ে বৃদ্ধ বাবা-মাকে ছেড়ে পাঞ্জাব, হরিযানা, মুম্বই গিয়ে কাজ করছেন। যাঁরা বাইরে যেতে পারেননি তাঁদের অনেকেই এখন পাথর ভাঙা, বাড়ি বাড়ি দিনমজুরি বা ফেরিওয়ালার কাজ করছেন। কিন্তু এসব করে যা উপার্জন হয তা দিযে সংসার চালানো মুশকিল।’

আলিপুরদুযার জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক তথা ভূমি ও ভূমি সংস্কার দপ্তরের জেলা আধিকারিক দীপঙ্কর পিপলাই বলেন, ‘নদীর ওপর নির্ভরশীল শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে ভিনরাজ্যে চলে যাচ্ছে, বিষয়টি কানে এসেছে।আমরা পকলিনের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি।কিছুদিন আগেই মহকুমাশাসকের নেতৃত্বে বিশেষ অভিযান চালানো হয়েছে। ওই সময় পকলিন এবং ডাম্পার ফেলে চাবি নিযে জঙ্গলে পালিযে যায় গাড়িচালক। তবে বেশকিছু ডাম্পার আটকও করা হয়। ক্রেনের সাহায্যে ডাম্পারগুলিকে তুলে আনা হলেও রিভার বেড থেকে ওই পকলিন তুলে আনা সম্ভব হয়নি। এছাড়া বিভিন্ন সময অভিযান চালাতে গিযে স্থানীয় বাসিন্দাদের বিক্ষোভের মুখেও পড়তে হয়েছে।’ ভূমি আধিকারিক বলেন, ‘ আমরা বালিপাথর তোলার কাজে যুক্ত কর্মহীন শ্রমিকদের আমরা সংগঠিত করার চেষ্টা চালিযে যাচ্ছি। প্রতিটি রিভার বেড এলাকায এই পেশায যুক্ত শ্রমিকদের নামের তালিকা তৈরি করার চেষ্টা চলছে। কতজন শ্রমিক বাইরে গিয়েছেন, সেই তথ্য সংগ্রহের চেষ্টাও চলছে। নিয়মিত অভিযান, সর্বোচ্চ জরিমানার পাশাপাশি শ্রমিকদের সংগঠিত করা গেলে বালিপাথরের অবৈধ কারবার রোখা সম্ভব হবে।’

ছবি : সংকোশ সেতু লাগোযা রিভার বেডে পকলিন বসিযে অবাধে বালিপাথর তোলা হচ্ছে।

তথ্য ও ছবি- নৃসিংহপ্রসাদ গঙ্গোপাধ্যায় ও গৌতম সরকার