অসহায় ভাই-বোনের পাশে পুলিশ, কাঠগড়ায় পঞ্চায়েত

449

কুশমণ্ডি : লকডাউনের মধ্যে ফের মানবিক মুখ দেখা গেল পুলিশের। এবারে কুমারগঞ্জে। অনাথ ও অসহায় দুই ভাইবোনের পাশে দাঁড়ানোর উদ্যোগ নিলেন থানার আইসি। পাশাপাশি দুঃস্থ ও নাবালক ওই দুই ভাইবোনের কোনও খোঁজ না রাখায় তিনি প্রশ্ন তোলেন গ্রাম পঞ্চায়েতের বিরুদ্ধেও।

গত বছর দীর্ঘ রোগভোগের পরে মারা  যান অধিকা সরকার। তাঁর কিছুদিনের মধ্যেই দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় স্বামী শিলু সরকারের। এরপরই অসহায় হয়ে পড়ে ওই দম্পতির দুই নাবালক সন্তান সংগীতা ও রতন। সংগীতা তখন অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী আর ভাই রতন পড়ত পঞ্চম শ্রেণিতে। মা-বাবার মৃত্যুতে দুই ভাই-বোনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়।  দুবেলা কোথা থেকে খাবার জুটবে সেই চিন্তায় রাতের ঘুম উড়ে যায় ভাই-বোনের। সেসময় তাদের পাশে দাঁড়াতে এগিয়ে আসেন প্রতিবেশী সুভাষ সরকার। কিন্তু জীবন তো রূপকথা নয়। তাই দুবেলা তাদের খাবার জোগাড় হলেও নিজেদের বাকি সব প্রয়োজন মেটাতে হিমসিম খেতে শুরু করে সংগীতা। খাবারের বদলে ওই প্রতিবেশীর বাড়ির সমস্ত কাজের ভার চলে আসে তার ওপর।

- Advertisement -

কুশমণ্ডি ব্লকের বেড়ইল পঞ্চায়েতের শেষ প্রান্তের একটি গ্রাম দেওখণ্ডা। সুভাষ রায়ে বাড়ির পাশেই এক চিলতে জমিতে কোনওমতে সংসার চালাতেন শিলু সরকার। তবে এখন সেই ঘরে থাকাও দায়। কিন্তু সেই ঘর সারিয়ে দেওয়ারও কেউ নেই। প্রতিবেশীরাও নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। প্রতিবেশীদের একাংশ জানান, সংগীতা ও রতনের এমন বিপর্যয়ের ঘটনা জানেন স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্যা চৈতালি সরকার। তিনি বলেন, ‘ মৃতদেহ সৎকারের জন্য সরকার যে ২০০০ টাকা দেয়, সেই টাকা আমি পাইয়ে দিয়েছিলাম।’ তবে সেখানেই পঞ্চায়েত সদস্যার কাজ শেষ হয়ে য়ায়। ওই দুজনের সঙ্গে আর কোনওরকম যোগাযোগ করেননি তিনি। কেন যোগাযোগ করেননি?  সেই প্রশ্নের কোনও সদুত্তর তাঁর কাছ থেকে পাওয়া যায়নি। একইভাবে পঞ্চায়েত প্রধান রিংকি দেবশর্মাও আর বাড়তি কোনও উৎসাহ দেখাননি সংগীতা আর রতনের জন্য। অবশেষে লকডাউন শাপে বর হল ওই দুই নাবালক ভাই-বোনের জন্য। লকডাউনের কারণে প্রকৃত দরিদ্র মানুষদের সাহায্য করতে নেমে সংগীতা আর রতনের হদিস পায় কুশমণ্ডি থানার করোনার নোডাল টিম। আইসি মানবেন্দ্র সাহা বলেন,  ‘পঞ্চায়েত কেন এতদিন ওদের পাশে দাঁড়ায়নি, জানি না। ওরা দুজন য়ে কত কষ্টের মধ্যে দিন কাটিয়েছে তা চোখে না দেখলে বোঝা যাবে না।’ এক জামা প্যান্টেই মাসের পর মাস কেটেছে রতন আর সংগীতার।  স্কুল যাওয়ার স্বপ্ন দেখাও ছেড়ে দিয়েছিল সংগীতা আর রতন। তবে আইসি অবশ্য জানিয়েছেন,  ‘ওদের পড়াশোনার জন্য টাকার কোনও সমস্যা হবে না। সেই ব্যবস্থা করব।’

এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে পঞ্চায়েতের কাজ কী? অসহায় ওই দুই ভাইবোনের পাশে না দাঁড়িয়ে ওই এলাকার পঞ্চায়েত কীভাবে দিব্যি এক বছর পার করে দিল? এলাকার এক লোকশিল্পী শান্তিরাম সরকার বলেন,  ‘পঞ্চায়েতের কাজ, দাযিত্ব এসবের সংজ্ঞা এখন পালটে গিয়েছে। কুশমণ্ডি ব্লকে কত অসহায় পরিবার আছে, তার কোনও সঠিক পরিসংখ্যান নেই প্রশাসনের কাছে। কেমন আছে সেসব পরিবার, সেই খোঁজটুকুও কোনওদিন পঞ্চায়েতের তরফে নেওয়া হয় না। আর তাই এভাবেই জীবনের মূলস্রোত থেকে মাঝপথে হারিয়ে যায় সংগীতা-রতনরা।’ এই ঘটনায় আশার আলো দেখিয়েছেন মহকুমা শাসক মানবেন্দ্র দেবনাথও। তিনি জানান, সংগীতা আর রতনের জন্য সবরকম সহযোগিতা করা হবে।

তথ্য ও ছবি- সৌরভ রায়