থানায় গেলেই স্বাগত জানায় মা সরস্বতীর বাহন

274

নাগরাকাটা : থানা মানেই পুলিশ। তাই যেচে কে আর থানায় যেতে চায়! নাগরাকাটা থানার ক্ষেত্রে কিন্তু ঘটনা পুরোপুরি অন্যরকম। এলাকাবাসী তো বটেই, বহিরাগতরাও পারলে একবারটি থানা চত্বর ঢুঁ মেরে যান। সৌজন্যে মা সরস্বতীর চার বাহন। কেউ এই চত্বরে এলেই চারে মিলে দৌড়ে গিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। নিজেদের ঢংয়ে স্বাগত জানানোর সেই ভাষায় যে সোহাগ জড়িয়ে পরিষ্কার, তা শুনলেই যে কেউই স্পষ্ট বুঝবেন। এই হংসবাহিনী শুধু পুলিশকর্মীদেরই নয়, গোটা এলাকারই নয়নের মণি।

১৯৯৩ সাল থেকে এই থানায় রাজহাঁস পোষার পর্বের শুরু। সেই সময় অলোক দাশগুপ্ত ওসি ছিলেন। একদিন কী ইচ্ছে হল দুধসাদা চারটি রাজহাঁস কিনে নিযে এসেছিলেন। হাঁসগুলিকে নিজের মতো বেড়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। অলোকবাবুর অপত্য স্নেহে সেই হাঁসগুলির সংখ্যা বাড়তে বাড়তে ৪২-এ ঠেকে। ২০১৫ সালে এক শীতসন্ধ্যায় বিপদ আসে। একদল কুকুর থানা চত্বরে হামলা চালিয়ে সমস্ত রাজহাঁস নিকেশ করে। ওই ঘটনায় শুধু এই থানাই নয়, তামাম নাগরাকাটাই মুষড়ে পড়েছিল। এরপর থেকে থানা চত্বরে গত চার বছর কোনো রাজহাঁস দেখা যায়নি। নতুন ওসি হিসেবে শুভাশিস চক্রবর্তী গত জুলাইয়ে এই থানায় যোগ দেন। রাজহাঁসকে ঘিরে এই থানার কী আবেগ রয়েছে তা তাঁর বিলক্ষণ জানা ছিল। কেননা, একটা সময় সাব-ইনস্পেকটর হিসাবে তিনি যে এই থানাতেই কাজ করেছিলেন। হারানো আবেগকে ঘরে ফেরাতে অলোকবাবুর মতো তিনিও চারটি রাজহাঁস কিনে আনেন। তারপর থেকেই আবার সেই ম্যাজিক। থানা চত্বরে কেউ এলেই তাঁকে স্বাগত জানাতে সমবেতভাবে রাজহাঁসগুলির তাঁর দিকে ছুটে যাওয়া। দেখে হাসছেন পুলিশকর্মীরা, এলাকার বাসিন্দারাও।

- Advertisement -

একেবারে আদি পর্ব থেকে সুভাষ বিশ্বাস নামে থানার এক পুলিশকর্মী হাঁসগুলি দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন। এখানে বীণাপাণির বাহনগুলির তিনিই অভিভাবক। সেগুলির খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে যত্নআত্তি, সবই তাঁর দায়িত্ব। এক্কেবারে ঘড়ির কাঁটা ধরে সব চলে। রাজহাঁসগুলির প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় চাল-গমের মতো দানাশস্য থাকে। থানা থেকেই এসব দেওয়া হয়। হাঁসগুলির সাঁতারের জন্য একটি চৌবাচ্চা তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। থানার সামনে ঘুরে বেড়ানো হাঁসগুলি সেই চৌবাচ্চার টলটলে জলে সাঁতার কাটে। পরে ফের থানার সামনে ফিরে আসে। সমস্বরে হাঁক পাড়ে। আবেগে ডুবে সুভাষবাবু বলছেন, ‘কীভাবে যে ওদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল টেরও পেলাম না। মাঝের চারটে বছর যেন কিছুতেই কাটতে চাইত না। শুভাশিসবাবুর জন্য কোনো ধন্যবাদই যথেষ্ট নয়।’

শুভাশিসবাবু এখন মাল থানার ওসি। তিনি বলছেন, ‘রাজহাঁসগুলি নাগরাকাটা থানার ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। নিয়মিতভাবে ওদের খোঁজখবর নিই। চাই ওরা ভালো থাকুক।’ নাগরাকাটা থানার বর্তমান ওসি সঞ্জু বর্মনও রাজহাঁস-প্রেমে মজেছেন। বলছেন, ‘ওদের প্রতি দায়িত্ব পালনে কোনো খামতিই রাখতে চাই না। আগন্তুকদের এমন নির্ভেজাল আপ্যায়ন আর কেই বা করতে পারে!’

তথ্য ও ছবি- শুভজিৎ দত্ত