মানুষ কাঁদছে, নেতারা কোন্দলে ব্যস্ত

প্রতীকী ছবি

রহিত বসু : আমার সকাল কাটে জানলার ধারে। করোনার মরশুমে ওই জানলাই প্রকৃতির সঙ্গে আমার যোগাযোগের মাধ্যম। সেখান থেকেই আমি আকাশ দেখি, পাখির ডাক শুনি। আমার জানলার পাশেই গাছের ডালে ছোট্ট একটি পাখি এসে বসে। তার সঙ্গে আমার কথোপকথন চলে-তুমি এসেছিলে পরশু, কাল কেন আসনি… ইত্যাদি।

আর সেই সময়ে হযতো কোচবিহার থেকে কেউ ফোন করে বলছে, সেখানে তৃণমূলের নতুন নতুন ব্লক সভাপতি নিযোগ হচ্ছে। আচ্ছা বলুন তো, কে তৃণমূলের ব্লক সভাপতি হল, তাতে মানুষের কী যায় আসে! এই বাজারে মানুষের চাকরি চলে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজ বন্ধ। পড়ুয়ারা জানে না কবে থেকে নিয়মিত পড়াশোনা শুরু হবে। সুযোগ বুঝে ফড়েরা জিনিসের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, আর তখন রবি ঘোষ ঢাকঢোল পিটিয়ে গোটা পৃথিবীকে জানাচ্ছেন, অন্য দল থেকে কর্মী টেনে তিনি কত বড় কাজ করে ফেলেছেন। আরেক নেতা পার্থপ্রতিম রায় নাটাবাড়ি বিধানসভা কেন্দ্রে রবি ঘোষের পায়ের নীচের মাটি কাটা প্রকল্পে ব্যস্ত। কোথাও তৃণমূল-বিজেপি সংঘর্ষ হচ্ছে, কোথাও আবার তৃণমূলের কোন্দল। আর আমি ভাবছি, এত সংঘর্ষ এবং কোন্দল হচ্ছে কেন? তৃণমূল নেত্রী বলছেন, এখন রাজনীতি করার সময় নয়। তা সত্ত্বেও কোন্দল কেন? বোমার স্টক ক্লিযারেন্স, না কি অন্য কোনও মতলব আছে?

- Advertisement -

জলপাইগুড়িতেও দেখুন না, একইরকম নাটক চলছে। দুই এমএলএ-কে নিয়ে জেলা সভাপতি জেরবার। মানুষ কত কষ্টে আছেন, সে সব নিয়ে তো এইসব নেতার মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয না। কে উঠছে, কে পড়ছে, সৌরভ চক্রবর্তীকে উত্তরবঙ্গে কোর কমিটির চেয়ারম্যান করায় গৌতম দেবের ডানা ছাঁটা গেল কি না, তা নিয়ে যাবতীয় চর্চা। মালদায় তো দেখলাম তৃণমূল নেতারা শুভেন্দু অধিকারীকে বলেছেন, এখনই বিধানসভা ভোটের প্রার্থীর তালিকা তৈরি করে ফেলতে। বুঝুন, আর তর সইছে না। জীবনে কত আনন্দ! অথচ, কোনও নেতাকে বলতে শুনবেন না, স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় উত্তরবঙ্গ কেন পিছিয়ে, কেন প্রশাসন লকডাউনের নিয়মকানুন আরোপ করতে ব্যর্থ। কিন্তু সবাই জানে, প্রধানত লকডাউন আরোপ করতে না পারার কারণেই করোনার সংক্রমণ রোখা যাচ্ছে না। মালদায় একদিনে ৪৪ জনসংক্রামিত, শিলিগুড়িজুড়ে আতঙ্ক। উত্তরবঙ্গের মানুষ যেন ধরেই নিয়েছেন, বঞ্চিত হওয়াটাই তাঁদের ভবিতব্য।

মানুষের জীবনে কি সমস্যার কোনও শেষ আছে! ভাত-কাপড়, রুটিরুজির কথা না হয় ছেড়েই দিলাম। শুধু পড়াশোনার কথা ভাবুন। করোনার মরশুমে অনলাইন শিক্ষাকে সর্বজনীন করার কথা আসছে। আমাদের এখানে তো দেখছি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রেও অনলাইন শিক্ষার কথা এসেছে। যে পরিবারের অভিভাবক দিনমজুর, পরিবারের ৪-৫টা পেটের জন্য দুবেলা ভাত জোগাড় করাই যাঁর জীবনে সব থেকে বড় চ্যালেঞ্জ, তাঁকে বাচ্চার অনলাইন শিক্ষার জন্য স্মার্টফোন জোগাড় করতে হবে। কীভাবে করবেন? নেতাদের কাছে কোনও জবাব আছে? অথচ নেতারা জানেন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে কোন পরিবারের বাচ্চারা যায় এবং তাদের কাছে শিক্ষা ও খাবারের মধ্যে কোনটা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

সমস্যাটা বোঝার জন্য আপনাদের কিছু পরিসংখ্যান দিই। ইন্টারনেট অ্যান্ড মোবাইল অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া (আইএএমএআই)-র এপ্রিল মাসের পরিসংখ্যান বলছে, আমাদের দেশে ৫০ কোটি ৪০ লক্ষের কাছাকাছি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অর্থাৎ, অধিকাংশ মানুষ অনলাইন লেনদেনের বৃত্তের বাইরে। এবার ভেবে দেখুন, কোনও পরিবারে যদি একাধিক পড়ুয়া থাকে তাহলে একই সময়ে অনলাইন পঠনপাঠনের জন্য একাধিক ফোন এবং ইন্টারনেট সংযোগের প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের কী হবে, কেউ কি ভেবেছেন? নেতারা? আমি তো বলব, যেসব নেতা দলীয় কোন্দল এবং এলাকা দখলের লড়াইয়ে ব্যস্ত, তাঁদের একবার জিজ্ঞেস করে দেখুন।