মানুষের এত ভাগ, ভোটের বাংলা যেন ৩০ বছর আগের উত্তর ভারত

227

সুব্রত সেন

পশ্চিমবঙ্গের ২০২১ সালের বিধানসভা ভোট যত এগিয়ে আসছে, তত তীব্র হচ্ছে একটা প্রশ্ন। এবারের নির্বাচন কি আদৌ উন্নয়ন কিংবা গুড গভর্ন্যান্স-এর ইস্যুতে হচ্ছে? নাকি এবারের নির্বাচনের লড়াই বিভাজনের ভিত্তিতে? এই প্রশ্ন উঠছে, কারণ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক দলগুলিই এবারের ভোটের স্লোগানে এমন কিছু জিনিসকে হাতিয়ার করেছে যা মূলত বিভাজনের ওপরে দাঁড়িয়ে। বাংলাবাসী বনাম বহিরাগত, মতুয়া সমাজ তথা নমশূদ্র, তপশিলি জাতি, উপজাতি এবং অবশ্যই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবারের ভোটে খুব বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যেও আবার ভাগ।

- Advertisement -

এমন নয় যে এ রাজ্যে এই ইস্যুগুলো কখনও ছিল না। ছিল তো বটেই, কিন্তু তা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল খবরের কাগজের পাত্রপাত্রী বিজ্ঞাপনে। নির্বাচনি প্রচারে কখনও তা খুল্লম খুল্লা এভাবে উঠে আসেনি। এর অর্থ একটাই। বাংলা, যা দীর্ঘদিন ধরে জাতিধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে এক ধরনের সবাইকে নিয়ে পথ চলার কথা বলত, তা ক্রমে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক তর্জা এবং বিভাজনের রাজনীতিতে বিসর্জিত হতে বসেছে বাংলার দীর্ঘদিনের ট্র‌্যাডিশন। তিরিশ বছর আগেও বাংলায় কোনও নির্বাচনি জনসভায় এভাবে বিভাজনের কথা উচ্চারিত হওয়া রীতিমতো নিন্দনীয় ছিল। এখন সেকথা কারও মাথায় নেই, স্রেফ ভোটের রাজনীতির অঙ্ক মেলানোর তাগিদে। অর্থাৎ একটু একটু করে বাংলার রাজনীতিতে একটা ভয়ানক পরিবর্তন এসেছে, যা আমরা ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করছি এবং হয়তো কিছুটা আতঙ্কিত হচ্ছি।

বছর তিরিশেক আগে উত্তর ভারতের রাজনীতিতে আমার মতো যেসব সাংবাদিক নির্বাচন কভার করেছেন তাঁরা ওই অঞ্চলে যা প্রত্যক্ষ করেছেন, এখন বাংলায় তা দেখা যাচ্ছে প্রতিটা কেন্দ্রে। কীভাবে সংখ্যালঘু ভোট একদিকে টেনে আনা যায়, কীভাবে হিন্দু ভোটের একটা অংশ কেটে দেওয়া যায় উচ্চবর্ণ ও নিম্নবর্গের ভোটারের সূক্ষ্ম বিভাজন ঘটিয়ে এই ধরনের রাজনীতি উত্তর ভারতে দেখা গেলেও তা বাংলাতে কখনও ছিল না। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচন যদি এর সূচনা হয়ে থাকে, ২০২১ সালে বোঝা যাচ্ছে এই বিভাজনের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে এখন গেড়ে বসেছে। এবং এই নির্বাচনের পর থেকে সম্ভবত এই সূক্ষ্ম বিভাজনের অঙ্কই রাজনীতির আসল খেলা হয়ে দাঁড়াবে। উন্নয়ন এবং গুড গভর্ন্যান্স বড় ইস্যু হবে না।

কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, বাংলাতে এখন যা হচ্ছে তা এক প্রকার হওয়ার কথাই ছিল। এখানে দেরিতে হয়েছে, এবং হয়তো এখনও উত্তর ভারতের মতো অতটা প্রকট হয়ে ওঠেনি কিন্তু সব রাজনৈতিক দলই যদি এভাবে একে অপরের বিরুদ্ধে বিভাজনের রাজনীতির অঙ্কের খেলাটাই খেলতে থাকেন তাহলে এই রাজ্য উত্তর ভারত হয়ে যাওয়া শুধু সময়ে অপেক্ষা। সূক্ষ্মভাবে যে ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে তার ফল ভুগতে হবে সারা ভারতের মতো এই রাজ্যকেও। পশ্চিমবঙ্গ নিজের মতো করে আলাদা থাকতে পারবে না।

স্বাধীন ভারতে এই বিভাজনের রাজনীতির সূত্রপাত মূলত পঁয়ত্রিশ- চল্লিশ বছর আগে। এবং তার জন্য অনেকাংশে দায়ী কংগ্রেস নিজে। একটা সময় পর্যন্ত কংগ্রেস দলটি ছিল একটা বড় ছাতার মতো, সেখানে নানা মত, নানা বর্ণ, নানা ধর্মের এক ধরনের সহাবস্থান ছিল। বামপন্থী এবং ডানপন্থীর সহাবস্থানও সেখানে স্বাভাবিক ছিল। আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটি এবং বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় কোনও জায়গাতেই কংগ্রেসের কোনও বিরোধ ছিল না।

এই অবস্থা পালটায় ইন্দিরা গান্ধির সময়ে যখন কংগ্রেস মুখে বারবার লেফট অফ সেন্টার রাজনীতির কথা বলতে শুরু করে। তারপরে জরুরি অবস্থাকে যদি ব্যতিক্রম অথবা ঐতিহাসিক ভুল হিসেবে কংগ্রেস ব্যাখ্যাও করতে চায় (এখনও করেনি), তা হলেও কংগ্রেসের একনায়কতন্ত্র প্রকট হয়ে পড়ে। কংগ্রেস এমনিতেও হাইকমান্ড নির্ভর পার্টি। সেখানে দলের সভাপতির কথাই শেষকথা। একটা সময় পর্যন্ত এই কংগ্রেসে এতদসত্ত্বেও বিভিন্ন রাজ্যের নেতারা গুরুত্ব পেতেন, ফলে রাজ্যস্তরের নেতারা এক ধরনের স্বাধীনতাও ভোগ করতে পারতেন, সেটা ক্রমে হ্রাস পেতে শুরু করল। রাজ্যস্তরের নেতারা দিল্লির মুখাপেক্ষী হয়ে উঠলেন। এই সমস্যা আরও ঘনীভূত হল রাজীব গান্ধির সময়ে। রাজ্যের অনেক নেতা ক্রমে অস্বস্তিতে পড়তে শুরু করলেন।

ঠিক এই সময়ে রাজীব গান্ধির মন্ত্রীসভা থেকেই বিশ্বনাথপ্রতাপ সিং বফর্স অধ্যায়ের সূচনা করলেন। এর পরে দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে তিনি ধামাচাপা হয়ে পড়ে থাকা মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট খুঁড়ে বের করলেন, বামফ্রন্ট এবং ভারতীয় জনতা পার্টির সমর্থনপুষ্ট সেই সরকার মণ্ডল কমিশনের রিপোর্ট লোকসভা এবং রাজ্যসভায় পেশ করল পিছিয়ে পড়া নিম্নবর্গের জাতির সংরক্ষণের জন্য। ভারতের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে বিশ্বনাথপ্রতাপের আনা এই সংরক্ষণের বিলটা গুরুত্বপূর্ণ বটে, কিন্তু এর ফলে ভারতের রাজনীতির রীতিনীতি বদলে গেল। জাতপাত দিয়ে রাজনীতির সমীকরণের যে খেলাটা এতদিন অবধি সব রাজনৈতিক দল সন্তর্পণে পরোক্ষভাবে খেললেও খোলাখুলি স্বীকার করত না, তা চলে এল একেবারে সামনে। সেটাই বড় ইস্যু হয়ে উঠল। ভারত, বিশেষত উত্তর ভারত ভাগ হয়ে গেল উচ্চ-বর্ণ, যাদব, বহুজন, তপশিলি ইত্যাদি ইত্যাদি নানাবিধ ভাগে।

মণ্ডলকে আটকানোর জন্য রাস্তায় নামল ভারতীয় জনতা পার্টি। ভারতের রাজনীতি স্বাধীনতার পরে এই প্রথমবার আবর্তিত হতে শুরু করল মণ্ডল বনাম কমণ্ডলু নিয়ে শুরু হল রামজন্মভূমি আন্দোলন, লালকৃষ্ণ আদবানির রথয়াত্রা, মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে এবং জয় শ্রীরাম হয়ে উঠল রাজনীতির স্লোগান। ভারতে বিভাজনের রাজনীতি এমন একটা জায়গায় পৌঁছে গেল যে তা থেকে আর পিছিয়ে আসার উপায় রইল না।

সত্যি কথা বলতে সেই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে এই বিভাজনের রাজনীতির ছোঁয়া লাগেনি। বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময়ে এই রাজ্য ছিল শান্ত। এর একটা কারণ বাংলায় বিভাজন নিয়ে তখনও কেউ খুব একটা মাথা ঘামাত না, সহাবস্থানই স্বাভাবিক রীতি ছিল। তাছাড়া মণ্ডল কমিশনের বহুজন-এর লিস্টে বাংলার পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উল্লেখ ছিল নামমাত্র। ভারতীয় জনতা পার্টিও সেই সময়ে এই রাজ্যে রাজনৈতিকভাবে কোনও জায়গাতেই ছিল না। জয় শ্রীরাম ধ্বনি বাংলার জনমানসে কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেনি।

প্রশ্ন হচ্ছে, গত দশ বছরে এমন কী ঘটল যাতে পশ্চিমবঙ্গে এবারের নির্বাচনের ফলাফল অনেকটাই নির্ভরশীল বিভাজনের রাজনীতি থেকে কোন দল কতটা সুবিধা আদায় করবে তার ওপরে? এর উত্তর নিহিত গত দশ বছরে রাজনীতির আঙিনায় ব্যাপকহারে টেকনলজির অনুপ্রবেশের মাধ্যমে। গত আট-দশ বছরে ইন্টারনেটের ব্যবহার সস্তা হয়েছে, সকলের কাছে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে সোশ্যাল মিডিয়া। যে কোনও রকম তথ্য ছড়িয়ে যেতে সময় লাগে না এতটুকু। এবং ইনফরমেশনের পাশাপাশি ফেক নিউজ ছড়িয়ে দেওয়াও সোজা।

২০১৪ সালে বিজেপি এই ইন্টারনেটের ব্যবহার অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছিল। তারা আলাদা আইটি সেল তৈরি করেছিল, সে তথ্যও গোপন নয় কারও কাছে। বিভাজনের ক্ষেত্রটি প্রস্তুত করতে এ রাজ্যেও সে কারণে সময় লাগেনি। ২০২১ সালে সে কারণেই পশ্চিমবঙ্গে এই অভিনব নির্বাচন। এর থেকে পিছিয়ে আসার আর কোনও রাস্তা সম্ভবত আর খোলাও নেই।