পরীক্ষা বাতিলে ভর্তি নিয়ে রাজনীতি ও ব্যাপক টাকার খেলা চলতে পারে

565

শুভঙ্কর চক্রবর্তী  

করোনা পরিস্থিতিতে ভোটগ্রহণ কতটা যুক্তিযুক্ত তা জানতে সাধারণ মানুষের মতামত নেওয়া হয়নি। হাজার হাজার লোকের সমাবেশ ঘটিয়ে করোনা ছড়িয়ে দেওয়া উচিত কি না তা বুঝতে মন কি বাত বা দিদিকে বলো-এর আয়োজন হয়নি। যদি হত, তাহলে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বন্ধ করার সিদ্ধান্ত হয়তো নিতে হত না।

- Advertisement -

মুখ্যমন্ত্রীর নিদান, পরীক্ষার্থীদের মূল্যায়ন পদ্ধতি ঠিক করবে বিশেষজ্ঞ কমিটি। শিক্ষক নিয়োগ পদ্ধতি ঠিক করতে ল্যাজেগোবরে হয়ে গিয়েছে রাজ্য শিক্ষা দপ্তর। সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষক, অভিভাবকদের একটা বড় অংশের অবস্থা এখন ঘরপোড়া গোরুর মতো। তাঁদের আশঙ্কা, বিশেষজ্ঞ কমিটি এমন কিছু করে না বসে, যা নিয়ে আবার কোর্টকাছারি শুরু হয়।

তবে পরীক্ষা না নেওয়ার সিদ্ধান্তে দুটি ঘটনা নিশ্চিতভাবে ঘটতে চলেছে। প্রথমত, প্রকৃত মেধার বহু ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে। দ্বিতীয়ত, রাজ্যজুড়ে শিক্ষাকে হাতিয়ার করে নতুনভাবে রাজনৈতিক ঘুঁটি সাজানোর কাজ শুরু হবে।

প্রশ্ন হল কীভাবে? পরীক্ষার্থীদের নম্বর দেওয়ার ক্ষেত্রে মুড়ি, মিছরি যে এক করা হবে তা নিয়ে মনে কোনও সন্দেহ রাখাটা অত্যন্ত বোকামির কাজ হবে। তাছাড়া আমাদের রাজ্যের আমলাদের ধরে আনতে বললে বেঁধে আনার প্রবণতা প্রবল। মুখ্যমন্ত্রী বলে দিয়েছেন, মূল্যায়ন এমনভাবে করতে হবে যাতে কোনও ছাত্রছাত্রী বঞ্চিত না হয়। কেউ যেন সমস্যায় না পড়ে। অতএব বুঝতেই পারছেন যোগ্য-অযোগ্য বিচার না করেই নম্বরের বন্যা বয়ে যাবে এবার। এবার নম্বর দেওয়ার ক্ষমতা স্কুলের হাতেই থাকছে। তাই কোনও স্কুলের শিক্ষকই চাইবেন না তাঁর পড়ুয়াকে কম নম্বর দিতে। স্বাভাবিক, ক্লাসের সব থেকে খারাপ পড়ুয়াটিও সাফল্যের সঙ্গে ভালো নম্বর নিয়ে পাশ করবে।

প্রতি বছরই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করার পর উত্তরবঙ্গের বহু ছাত্রছাত্রী কলেজে ভর্তি হতে পারে না। পেলেও অনার্স পড়ার সুযোগ পায় না। দুই ক্ষেত্রেই বাধা আসনসংখ্যা। এমনিতেই যত ছাত্রছাত্রী পাশ করে, তাদের ভর্তির জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যায় আসন নেই কলেজগুলিতে। কলেজ চালাতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের অনেক নিয়ম মানতে হয়। তাই চাইলেই কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ রাতারাতি আসনসংখ্যা বাড়াতে পারবে না।

নিশ্চিতভাবেই এবার পাশের হার বাড়বে। ভালো নম্বর প্রাপকের সংখ্যাও। ফলে কলেজগুলি আদৌ কি সমস্ত ছাত্রছাত্রীকে ভর্তি নিতে পারবে? অথবা আবেদনকারীদের অনার্স পড়ার সুযোগ করে দিতে পারবে? কলেজগুলির যা পরিকাঠামো, তার হিসেবে সোজা বাংলায় উত্তর হল না, পারবে না। আর ঠিক এই জায়গা থেকে শুরু হবে রাজনীতি।

কলেজে ভর্তি বা অনার্স পাইয়ে দেওয়ার জন্য গত কয়েক বছরে লক্ষ লক্ষ টাকার লেনদেনের ঘটনা সামনে এসেছে। প্রতিটি ঘটনাতেই নাম জড়িয়েছে রাজ্যের শাসকদলের ছাত্র সংগঠনের। এবার ভর্তি বা অনার্সের চাহিদা আরও বেশি হবে। তাই রাজনীতির খেলাও স্বাভাবিকভাবে বাড়বে। একই সঙ্গে টাকার লেনদেনও।

যখন দেখা যাবে আসন ১০০, আর আবেদনকারী ৫০০, তখন যার খুঁটির জোর থাকবে সেই ভর্তির সুযোগ পাবে। খুঁটির জোর মানে মাথার উপর নেতা বা আমলার হাত অথবা পকেটে প্রচুর টাকা। যার এগুলির কোনওটিই থাকবে না, সে ভর্তি হতে পারবে না বা অনার্স পাবে না। আর এভাবেই প্রকৃত মেধার বহু ছাত্রছাত্রীর ভবিষ্যৎ অন্ধকারে তলিয়ে যাবে। দিনহাটার ছাত্রীটির মতো তখন হতাশায় কেউ আত্মঘাতী হলে দায় নেবে কি সরকার?

মাধ্যমিক থেকে একাদশে ভর্তির ক্ষেত্রেও নেতার মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হবে অভিভাবকদের। সন্তানের মঙ্গলের জন্য যে কোনও বাবা, মা-ই সবকিছু করতে পারেন। তাই বিরোধীদের টাইট দেওয়ার এর থেকে ভালো সুযোগ আর পাবেন না শাসকদলের নেতারা। ভোটের ফল বের হওয়ার পর অনেক জায়গাতেই বিরোধী দলের সমর্থকদের র‌্যাশন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। উত্তরবঙ্গে কার্যত তৃণমূল করার মুচলেকা দিয়ে তবেই র‌্যাশন পেয়েছিলেন অনেক বিজেপি বা সিপিএম সমর্থক। এবার ছেলেমেয়েদের ভর্তির জন্যও শাসকদলে নাম লেখাতে হবে অনেককেই। আর যাঁরা তা করবেন না, তাঁদের বাড়ির পড়ুয়ারা আদৌ ভর্তির সুযোগ পাবে কি না তা বলা মুশকিল।

পরীক্ষা বাতিলের পক্ষে, বিপক্ষে অনেক যুক্তি আছে। পরীক্ষা না হলে ছাত্রদের বৌদ্ধিক বিকাশ কতটা ব্যাহত হবে সেটা নিয়ে শিক্ষাবিদরা তাঁদের মতামত নিশ্চয়ই দেবেন। সেই আলোচনার বাইরেও পরীক্ষা না হওয়ায় ভর্তি নিয়ে বাস্তবে যে রাজনীতি হবে সেটা ভয়ংকর। শহরের তুলনায় গ্রামে এই রাজনীতি অনেক বেশি কার্যকর হবে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন ই-মেলে তাঁরা ৩৪ হাজার মতামত পেয়েছেন। যাঁদের বেশিরভাগ পরীক্ষা নেওয়ার বিরুদ্ধে। প্রশ্ন হল, এই ৩৪ হাজার মতামত কাদের?

এ প্রসঙ্গে মিরিকের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট ও ডেপুটি কালেক্টর মৃদুল শ্রীমানির একটি কথা আমার খুব মনে ধরেছে। তাঁর মত, শিক্ষা বিষয়ে এক লাখ উন্মত্ত জনতার মতের চাইতে একজন বিদ্যাসাগরের মতের মূল্য বেশি। ৩৪ হাজারে কতজন বিদ্যাসাগর আছেন তা জানতে মন চায়। শাসকদল বা সরকারের রোষানলে পড়ার ভয়ে বেশিরভাগ শিক্ষক পরীক্ষা বাতিলের বিরোধিতা করছেন না। তবে মনেপ্রাণে চাইছিলেন পরীক্ষা নেওয়া হোক।

প্রতিটি শিক্ষার্থীই সুস্থ থাকুক এটাই চাই। তা সত্ত্বেও বলতে হয়, তাদের পরিবারের যে সদস্যরা বাইরে যাচ্ছেন, তাঁদের মাধ্যমে বাড়িতে থাকা পড়ুয়াটিও সংক্রামিত হতে পারে। শহরের খুব সচেতন পরিবারের পরীক্ষার্থীরাই হয়তো ঘরে থাকছেন। গ্রামের পরীক্ষার্থীদের বেশিরভাগই কিন্তু মাস্ক ছাড়াই প্রতিদিন মাঠে খেলছে, বাজারে যাচ্ছে। যাঁরা পরীক্ষা বাতিলের পরামর্শ দিয়েছেন, তাঁরা গ্রামের সেই পরীক্ষার্থীদের খোঁজ রাখেন না। পরীক্ষার জন্য আরও দুমাস অপেক্ষা করা যেত। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে সমস্ত সাবধানতা অবলম্বন করে পরীক্ষা নেওয়া যেত। আর এই দুই মাস সময়ে পরীক্ষার জন্য প্রযোজনীয় বন্দোবস্তও করতে পারত সরকার।

ব্যাংক বা অনেক চাকরির পরীক্ষার ক্ষেত্রেই একই মানের আলাদা প্রশ্নপত্রের সেট তৈরি করা হয়। তারপর পৃথক পৃথক দিনে কম কম করে পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা নেওয়া হয়। ভিড় এড়াতে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকের ক্ষেত্রেও সেই পদ্ধতি অবলম্বন করা যেত। তাতে সময় একটু বেশি লাগলেও সংক্রমণের আশঙ্কা অনেকটাই কম থাকত। বিকল্প না ভেবে কেন সরকার পরীক্ষা বাতিল করে দায় সারল তা এখনও বোধগম্য হচ্ছে না। সুযোগ পেলেই গলা বাড়িয়ে বলা হয়, বাংলা আজ যা ভাবে, দেশ কাল তা ভাবে। পরীক্ষা নিয়ে দেশকে দিশা দেখানোর সুযোগ ছিল বাংলার কাছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাংলার সরকার অনুসরণ নীতিতেই ভরসা রাখল। ব্যতিক্রম হতে পারল না।

উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা প্রত্যেকটি ছাত্রছাত্রী কলেজে ভর্তির সুযোগ পাবে এবং চাইলে অনার্স নিয়ে পড়তে পারবে- পরীক্ষা বাতিলের মতো এই দাবি সুনিশ্চিত করাও রাজ্যের দায়িত্ব।