মানুষকে হাসিয়ে এখন খিদের জ্বালায় কাঁদেন অনাথ

সপ্তর্ষি সরকার, ধূপগুড়ি : শেষ পঁচিশটা বছর রংবেরংয়ে আলো আর বাজনার তালে কখনও ট্রাপিজের দোলনা থেকে পড়েছেন নীচের জালে। আবার কখনও অদ্ভূত পোশাক পরে সহ শিল্পীর সঙ্গে খুনশুটি করে সার্কাসের তাঁবুতে তুলেছেন হাসির রোল। সরকারি সার্টিফিকেট অনুযায়ী, চল্লিশ ইঞ্চির শরীরে পঁয়ষট্টি শতাংশ অক্ষমতা নিয়ে একনাগাড়ে আনন্দ দিয়ে গিয়েছেন আট থেকে আশি সকল দর্শককে।

চলতি বছরের শুরুতেও ছবিটা ছিল এমনই। শেষবার গত মার্চ মাসে সার্কাসের তাঁবু পড়েছিল কোচবিহার জেলার জামালদহতে। এরপরেই শুরু লকডাউন, তাই বাকি অনেক কিছুর মতোই বন্ধ সার্কাসের শো। প্রথমদিকে টানা মাস তিনেক বন্ধ তাঁবুতে সমস্ত শিল্পীকে রেখে খাবারটুকু জুগিয়ে গেলেও শেষপর্যন্ত মালিকপক্ষও হাত তুলে নেন। ফলে গত জুলাই মাসে বাড়ি ফিরে আসা। সেই থেকে রোজগারশূন্য অবস্থাতে বাড়িতেই রয়েছেন জোকার অনাথ রায়। বিনামূল্যে র‌্যাশনটুকু মিললেও হাতে টান নগদ টাকার। রোজগার হারানো বাবার পাশে দাঁড়াতে দিনমজুরের কাজে নেমেছেন তাঁর একমাত্র ছেলে। তবে সেই কাজও নিয়মিত হয় না। ফলে তিনজনের সংসারে খিদের জ্বালা এখন নিত্যসঙ্গী। সব সমস্যার শেষ এখানেই নয়। ৪৮ বছর বয়সের শরীরে বাসা বেঁধেছে রোগ। নিয়মিত তার ওষুধও কিনতে হয়। সব মিলে অসহায় অনাথ এখন সরকারি সাহায্যের দিকে তাকিয়ে

- Advertisement -

২০১৪ সালে বিশেষভাবে সক্ষম হিসেবে সরকারি সার্টিফিকেট মিললেও আজ অবধি মেলেনি সরকারি কোনও সুবিধা। চালু হয়নি মানবিক প্রকল্পের মাসিক ভাতাও। ধূপগুড়ি কলেজপাড়া এলাকায় একচিলতে জমিতে সরকারি আবাস যোজনার ঘর নির্মাণ শুরু হলেও তার কাজ এখনও অসম্পূর্ণ। ফলে সার্কাসের তাঁবুতে মানুষের মুখে হাসি ফোটানো অনাথ ভাঙা ঘরে খিদে আর অর্থকষ্টকে নিত্যসঙ্গী করেই বেঁচে আছেন। জীবনের শুরুতেও এই খর্বাকৃতি নিয়ে সমস্যা ছিল। কিন্তু তারপর পুতুলনাচের দল, বিড়ি কোম্পানির প্রচার দলের অঙ্গ হয়ে অবশেষে নাম লেখানো সার্কাস কোম্পানিতে। সেই থেকে ঠিকঠাকই চলছিল সব। অভাবকে নিত্যসঙ্গী করেই দুই সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সংসার চলছিল একরকম।

তবে এই মহামারি আর লকডাউনের জেরে চরম দৈন্যদশায় এই শিল্পী। নিজের অসহায় অবস্থা নিয়ে এই সার্কাস শিল্পী বলেন, কর্মীরা ছাড়াও আমরা ৫২ জন শিল্পী ছিলাম। কাঠমান্ডুর বাসিন্দা ৩৬ ইঞ্চির কৈলে ছেত্রী এবং আমি দুজনে জোকার হিসেবে কাজ করতাম। সার্কাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অন্য শিল্পীরা কোনও না কোনও কাজে যুক্ত হয়ে গিয়েছেন। কিন্তু এই শরীরে আমার পক্ষে অন্য কাজ করা সম্ভব হয়নি। ছেলেটা মজদুর হিসেবে কাজ করে আপ্রাণ চেষ্টা করলেও নিয়মিত কাজ নেই। এই অবস্থায় অসহায়ভাবে চোখের জল ফেলা ছাড়া উপায় নেই।

শুধু এই সার্কাস শিল্পীই নন, মহামারির কবলে এমনই অসহায় অবস্থায় হাজার হাজার মানুষ যাঁরা মেলাকেন্দ্রিক পেশায় যুক্ত, তাঁদের মধ্যে অনাথদের অবস্থাটা সবচেয়ে বেশি শোচনীয় শারীরিক গঠনের কারণে। বিকল্প পেশা বেছে নেওয়াটাও তাঁদের পক্ষে খুব সহজ নয়। ফলে এই মহামারি শেষ হয়ে কবে ফের সার্কাসের তাঁবুতে ফেরা যাবে সেই অপেক্ষায় দিন গুনছেন অনাথের মতো বহু মানুষ। ধূপগুড়ির উপ পুরপ্রধান রাজেশকুমার সিং বলেন, আমরা শিবির করে সার্টিফিকেট তাঁদের হাতে তুলে দিয়েছি। পাশাপাশি তাঁদের মানবিক প্রকল্পের আওতায়ও আনা হয়েছে। উনি সম্ভবত বাড়ির বাইরে থাকায় নাম নথিভুক্ত হয়নি। আমরা বিষয়টি দ্রুত দেখব।