ভাত আর ভাপা শামুকে উদরপূর্তি চম্পার

মোস্তাক মোরশেদ হোসেন, রাঙ্গালিবাজনা : আগে ভাত জোটাতে কুড়োতে হত ধানের শিষ! জমির মালিক ধান কেটে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার পর বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া দেহটা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে মাঠে পড়ে থাকা ধানের শিষ কুড়িয়ে জোগাড় করতে হত অশীতিপর চম্পা মাঝিকে। এরপর নদী থেকে শামুক তুলতে যেতেন তিনি। দুই ছেলে ব্যস্ত নিজের নিজের সংসার নিয়ে। একমাত্র সঙ্গী বলতে মেয়ের ছেলে বছর উনিশের সুজিত। দিদার সঙ্গে ধানের শিষ থেকে শুরু করে জমিতে পড়ে থাকা ভুট্টাও জোগাড় করে সুজিত। দুজনের ভাতের মূল উৎস এতদিন ধরে ছিল এটাই। লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকে অবশ্য র‌্যাশন দোকান থেকে আতপ চাল মিলছে। আর রয়েছে বুড়িতোর্ষার শামুক। ওতেই এখন লাঞ্চ, ডিনার দুটোই সারেন দিদা-নাতি।

১৯৪০ সালে জন্ম চম্পা মাঝির। বাড়ি ফালাকাটা ব্লকের দক্ষিণ দেওগাঁওয়ে বাড়ি বলতে জীর্ণ একটা ঘর। বেঁচে থাকতে প্রায় তিরিশ বছর আগে সরকারের দাক্ষিণ্যে ছোট একটা ঘর জুটেছিল এক ছেলের বরাতে। কিন্তু ছেলেটাই বাঁচেনি। ছেলেটা না বাঁচলেও মরা ছেলের রেখে যাওয়া ঘরটার টিনের চালার নীচেই আজও রাত কাটান বৃদ্ধা। স্বামী শাওনা মাঝি মারা গিয়েছেন বহু বছর আগেই। উলুখাগড়ার, পাটকাঠির ওপর লেপা মাটির বেড়া ভেঙে গিয়েছে নানা জায়গায়। বেড়া আর খুলে পড়ে যেতে বসা টিনের চালে ঠেকা দিয়ে গাছের ডাল, বাঁশ কেটে গুঁজে দিয়েছেন চম্পা। তাতে কি আর বৃষ্টির জল আটকায়? তাই চেয়েছিন্তে গ্রাম পঞ্চায়েত কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একখানা ত্রিপল আদায় করেছেন বৃদ্ধা। সেখানেই দেখা গেল, পাশাপাশি দুটি ডেগচিতে লাঞ্চের আযোজন। একটায় দুমুঠো চাল, আরেকটায় নদী থেকে তুলে আনা শামুক। এটাই তাঁদের রোজকার মেনু।

- Advertisement -

দেওগাঁও গ্রাম পঞ্চায়েতের উপপ্রধান রহিফুল আলম অবশ্য বলেন, কাউকে ঘর দিতে গেলে বেশ কিছু সরকারি নিয়ম ও শর্ত মানতে হয়। এ বছর সমীক্ষার পর যে তালিকা তৈরি করা হয়েছে তাতে যতদূর সম্ভব ওই বৃদ্ধার নাম আছে। তবে ঘর পেলেও কবে পাবেন তা বলা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত ওই বৃদ্ধার জন্য সরকারের তরফে কোনও সাহায্য করা যায় কি না তা নিয়ে বিডিওর সঙ্গে কথা বলব। বৃদ্ধা বলেন, আগে নদী থেকে শামুক তুলে বিক্রি করতাম। কিন্তু এখন আর পারি না। বয়স হয়েছে। কোমরেও ব্যথা। আগের মতো শরীর চলে না। ভাতা পেতাম। অনেকদিন ধরে সেটাও পাই না। আজ পর্যন্ত একটা ঘর পেলাম না।

বৃদ্ধার জীর্ণ ঘরটার গা ঘেঁষেই দাঁড়িয়ে রয়েছে খয়েবাড়ি প্রকৃতি পর্যটনকেন্দ্রের দেওয়ালটা। ওপারে বিলাসবহুল রিসর্ট, পার্ক। বাম জমানায় সেখানে এসেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ও প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু। এখন আসেন তৃণমূল পরিচালিত রাজ্য সরকারের মন্ত্রীরা। তবে গত তিন-চার দশকেও দেওয়ালের এপারের আদিবাসীপাড়ার ওই হতদরিদ্র বৃদ্ধার দিকে নজর পড়েনি কারও।