বন্ধ সাহায্য, অনাহারেই দিন কাটছে ফেলো বেওয়ার

144

বিশ্বজিৎ সরকার, রায়গঞ্জ : বার্ধক্যের ভারে ন্যুব্জ। শীর্ণ শরীরে হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। দুইদিন আগে প্রতিবেশীর দেওয়া দুমুঠো ভাত খেয়েছেন। তারপর আর পেটে দানা পড়েনি। মুখে শুধু একটাই কথা আওড়াচ্ছেন, অনেক তো হলো আল্লা, আর কেন? এই যন্ত্রণা আর সহ্য হয না। আমায় ডেকে নাও এবার। পরিবারে দেখার কেউ নেই। মেলেনি সরকারি কোনো সাহায্য। প্রতিবেশীদের দয়ার ওপর নির্ভর করেই চলতে হয় রায়গঞ্জ থানার বছর পঁচাত্তরের ফেলো বেওয়াকে। অসহায় মানুষদের সাহায্য করার জন্য রাজ্য সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে সহায় প্রকল্প চালু করেছিল। তবে প্রচারের ঢক্কানিনাদের আড়ালেই হারিয়ে গিয়েছে সরকারি সদিচ্ছা। অসহায় ওই বৃদ্ধার বিষয়টি অবশ্য খোঁজ নিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন প্রশাসনের কর্তারা।

রায়গঞ্জ থানার শীতগ্রাম গ্রাম পঞ্চায়েতের বুরাকামাত এলাকার বাসিন্দা ফেলো বেওয়া। স্বামী মহম্মদ সমীর কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছেন। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে ভিনরাজ্যে। এক ছেলে অসুস্থ হয়ে মারা গিয়েছেন। বাকি দুই ছেলে বিয়ে করে অন্যত্র থাকেন। ফলে গ্রামের প্রান্তে ছোট্ট একটি চালাঘরে একলার সংসার ফেলো বেওয়ার। অবশ্য নামেই সংসার। চুলো জ্বলে না। কারণ রান্না করার ক্ষমতা তাঁর নেই। দ্বিতীয় কোনো প্রাণী নেই ঘরে। বাড়িতে গিয়ে ডাকতেই লাঠি হাতে বেরিয়ে এলেন। ঘর থেকে বের হয়ে সামান্য হাঁটতেই দম শেষ। খুঁটি ধরে বারান্দায় বসলেন। অর্ধাহারে-অনাহারে জীর্ণ শরীর।

কেমন আছেন জিজ্ঞাসা করতেই দুই চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল জল। বিরবির করে বললেন, দুদিন কিছু খাইনি। এই জ্বালা আর সহ্য হয় না। মরণ হলে বাঁচি। শরীর এতটাই দুর্বল বাড়ির বাইরে বেরোতে পারি না। পাড়ার লোকে দয়া করে কিছু দিলে খাই। না হলে না খেয়ে থাকতে হয়। সরকারি প্রকল্প থাকলেও মেলেনি সুফল। সহায় প্রকল্পের খাবার একসময় জুটলেও তিন বছর ধরে খাবার দেয় না সহায় প্রকল্পের কর্মীরা। শরীর যখন শক্ত ছিল তখন দিনমজুরি করে সংসার টেনেছি। এখন আর পারি না।

সংশ্লিষ্ট গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মধু কোড়া নাগবংশী বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই সহায় প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। ফের চালু করার জন্য বিডিওকে বলা হবে। পঞ্চায়েত দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক লাখ টাকার বকেয়া না মেটানোয় এই সমস্যা। পঞ্চায়েত ও গ্রামোন্নয়ন আধিকারিককে বারবার বলেও লাভ হয়নি। জেলার বিভিন্ন গ্রাম পঞ্চায়েত নিজেদের টাকা দিয়ে এই সহায় প্রকল্প চালু রেখেছিল। কিন্তু বকেয়া টাকা না পাওযায় উত্তর দিনাজপুর জেলার সমস্ত পঞ্চায়েতে সহায় প্রকল্প বন্ধ রয়েছে তিন বছর ধরে। জেলার আধিকারিকদের গাফিলতির জেরে কয়েক হাজার অসহায় মানুষ সহায় প্রকল্পের খাবার থেকে বঞ্চিত। গ্রামোন্নয়ন দপ্তরের আধিকারিক সুদেষ্ণা মিত্র বলেন, আমি কাজে যোগ দেওয়ার আগে থেকেই এই জেলায় সহায প্রকল্প বন্ধ রয়েছে। কী কারণে বন্ধ রয়েছে তা খোঁজ নিয়ে দেখব।