কৌশিক সরকার, দিনহাটা : এলাকায় স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, আছে কর্মীদের আবাসনও। কিন্তু চিকিৎসক নেই। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন দিনহাটা-২ ব্লকের একাধিক সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এমনই দশা। অভিযোগ, চিকিৎসকের অভাবে দিনহাটা-২ ব্লকে সরকারি চিকিৎসা পরিসেবা মুখ থুবড়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে।

গোটা ব্লকের ১২টি গ্রাম পঞ্চায়েতের ২ লক্ষ ৬৫ হাজার মানুষের চিকিৎসা পরিসেবার জন্য বর্তমানে রয়েছেন মাত্র চারজন সরকারি চিকিৎসক। বামনহাটের ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রয়েছেন একজন ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক সহ মাত্র দুজন চিকিৎসক। কিশামত দশগ্রাম ও নাজিরহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন করে চিকিৎসক রয়েছেন। তবে থরাইখানা এবং নয়ারহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র বর্তমানে চিকিৎসক শূন্য। এছাড়া ব্লকে কোচবিহারের রাজ আমলে স্থাপিত দিঘলটারি দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্রেও বর্তমানে কোনো চিকিৎসক নেই। চিকিৎসকহীন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি কোনোরকমে চলছে নার্সিং স্টাফ এবং ফার্মাসিস্ট-এর ওপর ভরসা করে। এ অবস্থায় চিকিৎসর জন্য ব্লকের গ্রামগঞ্জের সিংহভাগ মানুষকে স্থানীয় ওষুধের দোকানিদের ওপর ভরসা করেই চলতে হচ্ছে। এঁরাই এখন গ্রামগঞ্জের চিকিৎসক বলে অভিযোগ। এছাড়াও সরকারি চিকিৎসকের অভাবে এই ব্লকের বহু প্রত্যন্ত গ্রামে এখনও জাঁকিয়ে চলছে তাবিজ-কবচের ব্যবসা এবং ঝাড়ফুক, তুকতাক ইত্যাদির মতো কুসংস্কার।

দিনহাটা-২ ব্লক স্বাস্থ্য দপ্তর সূত্রে জানা গিয়েছে, বামনহাটে অবস্থিত ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে মোট অনুমোদিত চিকিৎসক পদ রয়েছে পাঁচটি। বর্তমানে রয়েছেন মাত্র দুজন চিকিৎসক। তাঁদের একজন ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক। দপ্তরের বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় তাঁকে। তিনি ছাড়া রয়েছেন আর মাত্র একজন মেডিকেল অফিসার। ফলে চব্বিশ ঘণ্টা চিকিৎসা পরিসেবা দিতে গিয়ে হিমসিম খেতে হয় তাঁদের। ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নার্সিং স্টাফ এবং অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরও বেশ কিছু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। শুকারুরকুঠি গ্রাম পঞ্চায়েতের থরাইখানা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘদিন ধরেই কোনো চিকিৎসক নেই। বাংলাদেশ সীমান্তঘেঁষা এই এলাকার মানুষের চিকিৎসা পরিসেবা চলছে স্থানীয় ওষুধের দোকানি বা গ্রাম্য কবিরাজদের উপর ভরসা করে বলে অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা মুকুল রহমান, সেকেন্দার আলি প্রমুখ বলেন, এলাকার সচেতন কিছু মানুষ চিকিৎসার জন্য ২৫ কিলোমিটার দূরে দিনহাটা শহরে যান। কিন্তু অধিকাংশর ভরসা স্থানীয় ওষুধের দোকানিরাই। এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দ্রুত চিকিৎসক নিয়োগের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন স্থানীয়রা।

অনেকটা একই রকম অবস্থা নয়ারহাট প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেরও। জনবহুল এই এলাকায় সরকারি চিকিৎসক না থাকায় ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে এলাকাবাসীকে। স্থানীয় ফজলু হক, আজম আলি প্রমুখ বলেন, এলাকার স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দীর্ঘ বছর ধরে চিকিৎসক নেই। তাই যেকোনো ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যায় বাধ্য হয়ে অনেককে ছুটতে হয় দিনহাটা শহরে। এতে অনেক সময় রোগীর অবস্থা আরও জটিল হয়ে পড়ে। আর কতদিন চিকিৎসকহীন অবস্থায় পড়ে থাকবে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র- সেই প্রশ্নও তুলেছেন এলাকার বাসিন্দারা। দিনহাটা-২ ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক ডাঃ কেশব রায় বিষয়টি কার্যত মেনেও নিয়েছেন। তিনি বলেন, ডিগ্রিধারী চিকিৎসকের অভাবে অনেক সময় কিছু সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে কুসংস্কারের শিকার হচ্ছেন। তবে গোটা ব্লকে চারজন মাত্র চিকিৎসক দিয়ে যতটা সম্ভব পরিসেবা দেওয়ার চেষ্টা চলছে বলে দাবি করেন তিনি। চিকিৎসকের অভাবের বিষয়টি ইতিপূর্বে স্বাস্থ্য দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

গোটা বিষয় প্রসঙ্গে স্থানীয় রোগীকল্যাণ সমিতির সভাপতি তথা এলাকার বিধায়ক উদয়ন গুহ বলেন, রাজ্যের সর্বত্রই চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসক ঘাটতি মেটানোর জন্য রাজ্য সরকার নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ খুলছে। দিনহাটা-২ ব্লকে আরও চিকিৎসক দ্রুত নিয়োগ করার জন্য স্বাস্থ্যকর্তাদের সঙ্গে কথা বলব। এই প্রসঙ্গে এসিএমওএইচ ডাঃ পরিতোষ মণ্ডল বলেন, চাহিদার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা কম। তাই কমবেশি সমস্যা সর্বত্রই রয়েছে। তবে ২০২১ সালের পর থেকে সমস্যা অনেকটাই মিটবে। অন্যদিকে, বামনহাটের অনেক বাসিন্দা অভিযোগ তুলেছেন, বছরদুয়েক আগে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য বামনহাটে এসে স্থানীয় স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকে গ্রামীণ হাসপাতালে উন্নীত করার আশ্বাস দেন। কিন্তু কোনো কাজ হয়নি। বরং ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের সংখ্যা তলানিতে পৌঁছেছে। মাত্র চারজন সরকারি চিকিৎসক দিয়ে গোটা ব্লকের চিকিৎসা পরিসেবা চলছে।